বরিশালের পাঁচটি অমীমাংসিত রহস্য — যা কোনো গাইডবুকে নেই | Barisal 5 mystery

বরিশালের পাঁচটি অমীমাংসিত রহস্য


বরিশাল — এই শহরের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্ধকার নদীর জল, শতবর্ষী বটগাছের ঝুলে পড়া শেকড় আর সন্ধ্যার পর নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া গ্রামের পথঘাট।

কিন্তু এই বরিশালেই এমন পাঁচটি অমীমাংসিত রহস্য আছে, যেগুলো কোনো ট্যুরিস্ট গাইডে লেখা থাকে না, গুগলে সার্চ দিলে পাওয়া যায় না। সেগুলো জানে শুধু এই মাটির মানুষ — সেই জেলেরা, যারা রাতের পর রাত নদীতে কাটিয়েছেন; সেই বৃদ্ধরা, যারা জমিদার বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে এমন কিছু দেখেছেন যা মরার আগেও ভুলতে পারবেন না।

আজকে আমি আপনাদের বলব বরিশালের পাঁচটি এমন রহস্যের কথা, যেগুলো এখনো অমীমাংসিত। পুলিশ থেমে গেছে, গবেষকরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন — কিন্তু রহস্যগুলো আজও বেঁচে আছে।

১. সুপারি বাগানের অজানা ছায়া

বরিশালের দক্ষিণ দিকে, যেখানে মানুষের বসতি পাতলা হয়ে আসে, সেখানে একটার পর একটা সুপারি বাগান দাঁড়িয়ে আছে — সারি সারি, যেন কোনো অদৃশ্য সেনাবাহিনী। এই বাগানগুলো বরিশালের ল্যান্ডস্কেপের অংশ। কিন্তু স্থানীয় মানুষদের কাছে এর মধ্যে একটা নির্দিষ্ট বাগান আছে, যেটার নাম তারা মুখে নিতেও চায় না।

বাগানটার অবস্থান সবাই জানে, কিন্তু কেউ সেখানে সন্ধ্যার পর যায় না। কারণ ওই বাগানে সন্ধ্যা নামলে একটা ছায়া দেখা যায় — কোনো মানুষের ছায়া নয়। ছায়াটা লম্বা, অস্বাভাবিক লম্বা — প্রায় ১৫ থেকে ২০ ফুট উঁচু। সুপারি গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে এই ছায়া ধীরে ধীরে নড়ে, যেন কেউ হাঁটছে — কিন্তু পা ফেলার কোনো শব্দ নেই, পরদিন সকালে কোনো পায়ের ছাপও পাওয়া যায় না।

স্থানীয়দের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো যে গল্পটা প্রচলিত, সেটা প্রায় ষাটের দশকের। তখন একজন কাঠুরে রাতে বাগানের পাশ দিয়ে ফিরছিল। হঠাৎ সে খেয়াল করল তার নিজের ছায়াটা তার সাথে মিলছে না — তার ছায়া ঠিকই পাঁচ-ছয় ফুটের, কিন্তু পাশে আরেকটা ছায়া ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। সে ঘুরে তাকাল — পেছনে কেউ নেই, কিন্তু সেই ছায়া আছে। লোকটা ভয়ে দৌড়ে বাড়ি ফিরেছিল। পরদিন সকালে তার জ্বর ১০৪। তিনদিন তিনরাত প্রলাপ বকেছে — শুধু একটা কথাই বারবার বলেছে: "ওটা আমার দিকে তাকাইয়া ছিল। ওর কোনো মুখ নাই, তাও আমি জানি ওটা আমার দিকে তাকাইয়া ছিল।"

এখন যৌক্তিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে? কেউ কেউ বলে সুপারি গাছগুলোর পাতলা কান্ড আর চাঁদের আলোর কোণের কারণে একটা অপটিক্যাল ইলিউশন তৈরি হয়। বাতাসে গাছ নড়লে ছায়াগুলো মুভ করে, যেটাকে মানুষের মস্তিষ্ক একটা ফিগার হিসেবে ইন্টারপ্রেট করে। এটাকে বলে প্যারাইডোলিয়া — মানে মস্তিষ্ক যেখানে অস্পষ্ট আকৃতির মধ্যে মানুষের রূপ খোঁজে।

কিন্তু একটা সমস্যা আছে। যারা এই ছায়া দেখেছে বলে দাবি করে, তাদের মধ্যে চারজন পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে অদ্ভুত দুর্ঘটনায় মারা গেছে — একজন নদীতে ডুবে, একজন গাছ থেকে পড়ে, একজন সাপের কামড়ে। আর চতুর্থজনকে একদিন সকালে সেই বাগানের ভেতরেই পাওয়া গেছে — চোখ খোলা, শরীরে কোনো আঘাত নেই, কিন্তু মৃত। ডাক্তার বলেছিল কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, কিন্তু লোকটার বয়স ছিল মাত্র ৩৩ — কোনো হার্টের সমস্যা ছিল না। তাহলে ওই বাগানে কী হয়েছিল? কী দেখেছিল সে, যেটা তার হৃদপিণ্ড থামিয়ে দিয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আজও কারো কাছে নেই।

২. তেঁতুলিয়ার মরণ বাঁক

বরিশালের নদীগুলো এমনিতেই বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু তেঁতুলিয়া নদীর একটা নির্দিষ্ট বাঁকের কথা আলাদা করেই বলতে হয়। স্থানীয় মাঝিরা এই বাঁকটাকে ডাকে "মরণ বাঁক"।

গত ৪০ বছর ধরে এই একটা পয়েন্টে কমপক্ষে ২০টারও বেশি নৌকা ডুবেছে, লঞ্চ উল্টেছে, ট্রলার নিখোঁজ হয়েছে। আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার — কিছু কিছু ক্ষেত্রে নৌকাটা পাওয়া গেছে, কিন্তু ভেতরের মানুষগুলোকে পাওয়া যায়নি। নৌকা অক্ষত, জালপত্র ঠিক আছে, এমনকি চুলার রান্নাও অর্ধেক হওয়া অবস্থায় — মানুষগুলো হুট করে উধাও হয়ে গেছে, যেন কেউ তাদের টেনে নিয়ে গেছে।

বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে — তেঁতুলিয়া নদীর ওই নির্দিষ্ট বাঁকে পানির নিচে কী আছে, সেটা কখনো ঠিকমতো সার্ভে হয়নি। তবে কিছু ভূতত্ত্ববিদ মনে করেন এখানে নদীর তলদেশে হঠাৎ একটা গভীর গর্ত আছে, যেটাকে বলে আন্ডারওয়াটার সিংক হোল। এই ধরনের গর্ত হঠাৎ করেই পানিতে একটা ঘূর্ণি তৈরি করতে পারে, যেটা এতটাই শক্তিশালী যে একটা ছোট্ট নৌকা সেকেন্ডের মধ্যে টেনে নামিয়ে ফেলে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই ব্যাখ্যা দিলে নৌকাটা থাকবে কীভাবে? যদি ঘূর্ণি এতই শক্তিশালী যে মানুষকে ডুবিয়ে দেয়, তাহলে নৌকাটাও তলিয়ে যাওয়ার কথা — কিন্তু নৌকা পাওয়া যাচ্ছে ভাসা অবস্থায়, মানুষ নেই।

২০০৭ সাল, শীতকাল। একটা মাছ ধরার ট্রলার তিনজন জেলেকে নিয়ে বের হয়েছিল। পরদিন সকালে ট্রলারটা পাওয়া গেল ওই বাঁকের কাছে — ইঞ্জিন চালু, আলো জ্বলছে, রেডিওতে গানও বাজছে। কিন্তু তিনজনের কেউ নেই। ট্রলারের ডেকে একটা অদ্ভুত জিনিস পাওয়া গিয়েছিল — একটা মোবাইল ফোন। যেটায় শেষ কলটা করা হয়েছিল রাত ২টা ৭ মিনিটে, কল রিসিভ হয়নি। কিন্তু ফোনের ভয়েস নোটে একটা অডিও ছিল — মাত্র ১১ সেকেন্ডের। প্রথম পাঁচ সেকেন্ড নদীর জলের শব্দ, তারপর একটা চাপা চিৎকার, তারপর একটা শব্দ যেটা কেউ চিহ্নিত করতে পারেনি — পানি ফুটে ওঠার মতো, কিন্তু পানির শব্দ নয়; একটা গভীর বাবলিং-রামলিং শব্দ, যেন নদীর তলা থেকে কিছু একটা উঠে আসছিল।

সেই তিনজন জেলেকে আর কোনোদিন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

৩. হারমাতদের গুপ্ত সুরঙ্গ

ষোলো ও সতেরো শতাব্দী। পর্তুগিজ আর আরকানি জলদস্যুরা — যাদের স্থানীয়রা ডাকত "হারমাত" — এরা বরিশালের উপকূলীয় অঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব চালাত। লুটপাট, অপহরণ, দাস ব্যবসা — এগুলো ছিল তাদের রুটিরুজি। কিন্তু ইতিহাসে একটা জিনিস ঠিকমতো লেখা নেই — তাদের ঘাঁটিগুলো ঠিক কোথায় ছিল?

এখানেই আসে বেকারগঞ্জের কথা। বর্তমান বরিশালের যে অংশটা আগে বেকারগঞ্জ জেলা নামে পরিচিত ছিল, সেখানে মাটির গভীরে এমন কিছু কাঠামো পাওয়া গেছে যা ইতিহাসবিদদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে।

২০১২ সালে একটা পুকুর খননের সময় শ্রমিকরা মাটির প্রায় ১২ ফুট নিচে একটা ইটের দেয়ালের অংশ পায়। প্রথমে সবাই ভেবেছিল পুরনো কোনো বাড়ির ভিত — কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি একটু এগোতেই দেখা গেল এটা কোনো বাড়ি নয়, এটা একটা সুরঙ্গপথ। এবং সেই সুরঙ্গ নিচের দিকে নেমে গেছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে।

স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হলো, কিছু অফিসার এসে দেখলেন — কিন্তু কেউ ভেতরে ঢুকতে রাজি হলেন না। কারণ ভেতর থেকে একটা গন্ধ আসছিল — পচা, ভেজা এবং অচেনা। সেই সাথে একটা অদ্ভুত ব্যাপার: সুরঙ্গের মুখে দাঁড়ালে ভেতর থেকে একটা ফিসফিসানির মতো শব্দ পাওয়া যেত। বাতাসের কারণেও হতে পারে — সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে বাতাস বইলে অনেক সময় এরকম শব্দ হয়। কিন্তু শ্রমিকরা বলেছিল অন্য কথা: "ওটা বাতাস না, ওটা কেউ কথা কইতেছে, কিন্তু ভাষাটা চিনতে পারতেছি না।"

কিছুদিন পর সুরঙ্গটা ভরাট করে দেওয়া হলো। কেন? কে নির্দেশ দিয়েছিল? কোনো সূত্রে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। কিন্তু একজন স্থানীয় সাংবাদিক — যিনি এই নিয়ে একটা ছোট্ট রিপোর্ট করেছিলেন — তিনি দাবি করেছিলেন যে সুরঙ্গের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট পর্যন্ত একটা দল ঢুকেছিল। রিপোর্ট অনুযায়ী দেয়ালে পর্তুগিজ ভাষায় কিছু লেখা ছিল, মেঝেতে মরচে ধরা কিন্তু এখনো মজবুত শিকল পাওয়া গিয়েছিল — এবং সুরঙ্গের এক কোণে মানুষের হাড়। কতগুলো হাড়? সেটাই ভয়ের জায়গা। রিপোর্টে শুধু লেখা ছিল: "সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।"

এটা ছিল হারমাতদের গুপ্ত অন্ধকূপ, যেখানে অপহৃত মানুষদের রাখা হতো বিক্রি করার আগে। কিন্তু কেউ কেউ বলে শুধু অপহৃত মানুষ নয় — এখানে আরো কিছু হতো। কিছু আচার-অনুষ্ঠান, যেগুলো পর্তুগিজ জলদস্যুদের মধ্যে প্রচলিত ছিল — সমুদ্রের দেবতার উদ্দেশ্যে নরবলি।

সেই সুরঙ্গ আজ মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। ওপরে এখন ধানক্ষেত। কিন্তু যারা ওই জমিতে কাজ করে, তারা এখনো বলে — বর্ষার রাতে মাটির নিচ থেকে কান্নার আওয়াজ আসে।

৪. রায়েরকাঠির অভিশপ্ত মঠ

বরিশালের পিরোজপুরের রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি — একটা ঐতিহাসিক স্থাপনা। কাঠামোটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে — ভাঙাচোরা, ক্ষয়ে যাওয়া, কিন্তু এখনো একটা আভিজাত্যের আভাস আছে। ট্যুরিস্টরা আসে ছবি তুলতে, ব্লগাররা আসে কন্টেন্ট বানাতে। কিন্তু জমিদার বাড়ির মূল কমপ্লেক্সের পেছনে ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা মঠ আছে, যেটা কেউ দেখতে যায় না।

মঠটা কালী মন্দির ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু স্থানীয় বয়স্করা বলেন এটা শুধু মন্দির ছিল না — এখানে তান্ত্রিক সাধনা হতো। জমিদারদের পারিবারিক পুরোহিত নাকি ব্রহ্মচারী তন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। শ্মশান থেকে আনা ছাই, মানুষের মাথার খুলি — এগুলো দিয়ে রাতের পর রাত পূজা চলত এই মঠে।

রহস্যটা শুরু হয় ১৯৭১-এর পর থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই জমিদার বাড়িতে কী হয়েছিল, তার স্পষ্ট কোনো ইতিহাস নেই। কিন্তু স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, পাকিস্তানি আর্মির একটা ছোট্ট ইউনিট এই বাড়িতে ক্যাম্প করেছিল এবং ওই মঠটাকে তারা ব্যবহার করত নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে। যুদ্ধের পর বাড়িটা পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

কিন্তু আশির দশক থেকে মঠটা নিয়ে অদ্ভুত সব রিপোর্ট আসতে শুরু করে। প্রথমত, মঠের ভেতরে রাতে আলো দেখা যায় — ফ্লিকারিং লালচে আলো, যেন কেউ মোমবাতি জ্বালিয়েছে। কিন্তু সকালে গিয়ে দেখা যায় কোনো মোম নেই, কোনো আগুনের চিহ্ন নেই — শুধু মেঝেতে একটা জায়গা আছে যেটা বাকি মেঝের তুলনায় সবসময় গরম থাকে।

দ্বিতীয়ত, এবং এটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর — মঠের সামনে দিয়ে হাঁটলে কেউ কেউ একটা অদ্ভুত অনুভূতির কথা বলেন। তারা বলেন মনে হয় কেউ পেছন থেকে ঘাড়ে ফুঁ দিচ্ছে। ঘুরে তাকালে কেউ নেই। কিন্তু সেই মুহূর্তে মঠের অন্ধকার দরজার ভেতর থেকে দুটো চোখ দেখা যায় — লাল নয়, সাদা নয়, চোখ দুটো সম্পূর্ণ কালো। কোনো মণি নেই, কোনো সাদা অংশ নেই — শুধু গভীর অন্ধকার গহ্বর।

সংশয়বাদীরা বলবেন এটা পরিত্যক্ত জায়গায় প্যাঁচা বা বাদুড়ের চোখের প্রতিফলন। হতেও পারে। কিন্তু তাহলে ঘাড়ে ফুঁ দেওয়ার অনুভূতি — প্রায় ২০ জনের বেশি মানুষ স্বতন্ত্রভাবে একই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন — এটা কি সবার ক্ষেত্রে কাকতালীয়?

রায়েরকাঠির সেই মঠ আজও দাঁড়িয়ে আছে, ঝোপের আড়ালে, নীরবে — যেন কারো জন্য অপেক্ষা করছে।

৫. কালু মাঝির মাথাবিহীন নৌকা

এই রহস্যটা বলতে গেলে একটু অস্বস্তি লাগে। কারণ এটা শুধু রহস্য নয় — এটা একটা আতঙ্ক, যেটা সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী মানুষদের রক্তে মিশে আছে।

সন্ধ্যা নদী — বরিশালের আরেকটা নদী, নামটাই যেন রহস্যময়। এই নদীতে রাতের বেলা মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা একটা অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যেটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। তারা বলেন, রাত গভীর হলে যখন চারদিকে কুয়াশা নামে, তখন নদীর উপর একটা নৌকা দেখা যায় — পুরনো কাঠের তৈরি, জীর্ণ। আর সেই নৌকায় একজন মাঝি দাঁড়িয়ে। কিন্তু মাঝির কোনো মাথা নেই — ঘাড়ের উপর থেকে কিছুই নেই। শুধু শরীর, দুটো হাত বৈঠা ধরে আছে, পা নৌকায় দাঁড়িয়ে আছে — কিন্তু মাথা নেই। আর সে ধীরে ধীরে দাঁড় বেয়ে কুয়াশার ভেতর এগিয়ে যায়।

এই গল্পের পেছনে একটা ইতিহাস আছে। ব্রিটিশ আমলে, উনিশ শতকের শেষ দিকে, সন্ধ্যা নদীতে একটা ফেরি চলত। ফেরির মাঝির নাম ছিল কালু — গরিব, সাধারণ একটা মানুষ। কিন্তু কালু ছিল একটু অন্যরকম — সে নদীকে ভালোবাসত, যেন নদী তার পরিবার।

একদিন রাতে কালু ফেরি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিল। নৌকায় কয়েকজন যাত্রী ছিল, তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নীলকুঠির ম্যানেজার। মাঝ নদীতে কোনো এক কারণে ঝগড়া বাধে — কেউ বলে কালু বেশি ভাড়া চেয়েছিল, কেউ বলে ম্যানেজার কালুকে অপমান করেছিল। যাই হোক, সেই রাতে নৌকা ঘাটে ফিরল, কিন্তু কালু ফিরল না। পরদিন সকালে তার শরীর পাওয়া গেল নদীর পাড়ে — মাথাবিহীন। মাথাটা কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ রিপোর্ট হয়েছিল, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে একজন গরিব মাঝির মৃত্যুকে নিয়ে কে মাথা ঘামাবে — কেসটা বন্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হলো দেখা পাওয়া। প্রথমে কয়েকজন জেলে, তারপর ফেরি যাত্রী, তারপর নদীর পাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলো — একে একে সবাই একই কথা বলতে শুরু করল: "কুয়াশার রাইতে কালু মাঝি আসে, দাঁড় বায়, কিন্তু কোনো শব্দ করে না, কোনো ঢেউ ওঠে না তার নৌকায় — সে শুধু ভাইসা যায়।"

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে ১৯৯৪ সালে। সাতজন কলেজছাত্র ঠিক করল তারা এই কিংবদন্তি ভুল প্রমাণ করবে। কুয়াশার রাতে তারা একটা নৌকা নিয়ে সন্ধ্যা নদীতে গেল — সাথে ক্যামেরা, টর্চ সব। রাত দুটোর দিকে তারা কুয়াশার মধ্যে কিছু একটা দেখেছিল।

সাতজনের মধ্যে পাঁচজন পরদিন সকালে ঘাটে ফিরে এসেছিল — চুপচাপ, ফ্যাকাসে মুখ। তারা কেউ কিছু বলতে রাজি হয়নি। শুধু একজন পরে একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিল: "আমরা ওইটা দেখেছি। ঠিক যেইভাবে সবাই বলে, ঠিক সেইভাবেই। কিন্তু একটা জিনিস কেউ বলে না — ওই নৌকা যখন কাছে আসে, শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। এত ঠান্ডা লাগে মনে হয় হাড় জমে যাচ্ছে। আর একটা গন্ধ পাওয়া যায় — রক্তের গন্ধ।"

আর বাকি দুজন — তারা ফেরেনি। তাদের নৌকাটা পরদিন পাওয়া গিয়েছিল উল্টানো অবস্থায়। তাদের শরীর পাওয়া গিয়েছিল তিনদিন পর, নদীর ভাটিতে — ডুবে মারা গেছে বলে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু একটা জিনিস রিপোর্টে লেখা হয়নি, যেটা শুধু ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার জানতেন — দুজনের মুখ স্থির হয়ে গিয়েছিল, যেন তারা মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে এমন কিছু দেখেছিল যা দেখে তাদের মুখের পেশি এমনভাবে সংকুচিত হয়ে গেছে যে মৃত্যুর পরেও সেই এক্সপ্রেশন রয়ে গেছে। সেই এক্সপ্রেশনটা কী ছিল? বিশুদ্ধ, খাঁটি আতঙ্ক।

শেষ কথা

বরিশাল — সুন্দরী বরিশাল, নদীমাতৃক বরিশাল, কীর্তনখোলার বরিশাল, ইলিশের বরিশাল। কিন্তু এই বরিশালেরই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে এমন সব গল্প, যেগুলো দিনের আলোতে কেউ বলতে চায় না। রাতের অন্ধকারে মশারির ভেতর চাপা গলায় — শুধু তখনই এই গল্পগুলো বেঁচে ওঠে।

আজকে আমি আপনাদের পাঁচটা রহস্যের কথা বললাম — পাঁচটাই অমীমাংসিত, পাঁচটাই এখনো উত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো — এই পাঁচটা কি সত্যিই আলাদা আলাদা রহস্য? নাকি এগুলো একটাই অন্ধকারের আলাদা আলাদা মুখ?

সুপারি বাগানের লম্বা ছায়া, তেঁতুলিয়ার মৃত্যুফাঁদ, হারমাতদের অন্ধকূপ, অভিশপ্ত মঠের কালো চোখ আর কাটা মাথার মাঝি — যদি এই সবকিছুর পেছনে একটাই সত্য থাকে, তাহলে সেই সত্যটা কী?

সেটা হয়তো আমার আপনার জানার কথা নয়। কিছু কিছু রহস্য অমীমাংসিত থাকাটাই ভালো।

আপনার কি মনে হয়? এই পাঁচটা রহস্যের কোনটা সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর? আপনি কি বরিশালের এমন কোনো গল্প জানেন, যেটা আজও কেউ ব্যাখ্যা করতে পারেনি? তাহলে কমেন্টে জানান।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url