শয়তানের ছায়া | একটি ভৌতিক গল্প voutik golpo

শয়তানের ছায়া | একটি ভৌতিক গল্প voutik golpo


অমিতাভ মস্ত বড় লোকের একমাত্র ছেলে। কলকাতার বেশ কয়েক মাইল দূরে পলাশপুরে ওদের প্রকান্ড দালানবাড়ি দেখে হকচকিয়ে গিয়েছিল দিব্বেন্দু। একটা নামি হোস্টেলে থেকে অমিতাভ পড়াশোনা করত। ছুটিছাটায় পলাশপুর চলে যেত — কলকাতা নাকি ওর ভালো লাগত না। ভালো ক্রিকেট খেলত, কলেজের ক্যাপ্টেন হয়েছিল। সেই সুবাদে আর পোশাক-পরিচ্ছেদের পারিপাট্যে খুব অল্পদিনেই ও ছাত্রমহলে প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল।

অন্যদিকে কে দিব্বেন্দু? সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। ওকে পরিশ্রম করে বড় হতে হবে — এই ধারণাটা ওর মা-বাবা ছোটবেলা থেকেই ওর মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। স্কুলে বরাবর ভালো রেজাল্ট করে চারটে লেটার নিয়ে ওর শেষ ধাপটা ডিঙিয়েছিল। অমিতাভর টাকাপয়সার অভাব ছিল না, আর দিব্বেন্দুর ছিল না আত্মপ্রত্যয়ের অভাব।

দুজনের মধ্যে অনেক বিষয়ে ঘোর অমিল সত্ত্বেও কেমন করে যে মনের মিল হয়ে গেল, সেটাই আশ্চর্য। অমিতাভ মাঝেমধ্যেই দিব্বেন্দুকে তার দেশের বাড়িতে নিয়ে গেছে — বলতে গেলে প্রায় বগলদাবা করেই নিয়ে গেছে, কোনো ওজর-আপত্তি গ্রাহ্য করেনি। পলাশপুরের প্রকান্ড বাড়িতে শুধু অমিতাভর বাবা আর এক বিধবা পিসি, একপাল ঝি-চাকর নিয়ে বাস করতেন। অমিতাভর বন্ধু বলে দিব্বেন্দুও যেন ওই বাড়িরই একজন হয়ে গিয়েছিল। অমিতাভর ব্যক্তিগত অনেক ব্যাপারেই ও হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা। আপনা থেকেই যেন একটা দায়িত্ব বর্তে গিয়েছিল ওর উপর।

সবকিছু ঠিকই চলছিল। কিন্তু কলেজের শেষ বছরে পরীক্ষার ঠিক মুখে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, প্রথমে অমিতাভর বাবা, তারপর পিসি মারা গেলেন। অমিতাভর আর পরীক্ষা দেওয়া হলো না।

দিব্বেন্দু এই আকস্মিক ঘটনায় খুব দুঃখ পেয়েছিল। তবে অমিতাভর মনের উপর দিয়ে যে কী ঝড় বয়ে গিয়েছিল তা দিব্বেন্দু ভাবতে পারেনি — সম্ভবও নয়। তারপরেই কী যেন হলো, পলাশপুর ছেড়ে চলে গেল অমিতাভ। মাঝে মাঝে দিব্বেন্দু ওর চিঠি পেয়েছে — খুব সংক্ষিপ্ত চিঠি, ভারতবর্ষের নানান তীর্থস্থান থেকে। তারপর একসময় সে চিঠিও বন্ধ হয়ে গেল।

প্রথম প্রথম চিন্তা হত বন্ধুর জন্য। তারপর পড়াশোনা আর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তাগিদ সব ঠিক করে দিল। সে আজ আট বছর আগেকার কথা। ইতিমধ্যেই দিব্বেন্দু সিএ পাস করে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়েছে। একটা বড় প্রতিষ্ঠানে ও কর্মজীবন শুরু করেছিল। বছর দেড়েক হলো নিজের ফার্ম করেছে। অল্পদিনের মধ্যেই ওর প্রতিষ্ঠানের নাম ছড়িয়ে পড়েছে। তাই বিস্তর কাজ। এ সবকিছুর মূলেই আছে দিব্বেন্দুর উদ্যম, আত্মবিশ্বাস, আদর্শবোধ আর নিষ্ঠা। ইংরেজিতে যাকে বলে 'সেলফ-মেড ম্যান' — দিব্বেন্দু হলো তাই।

সাতটার কিছু আগেই দিব্বেন্দু গ্রিন ভ্যালি রেস্টোরাঁয় পৌঁছে গেল। মনে মনে একটা উত্তেজনা অনুভব না করে পারছিল না। অমিতাভর প্রতি ওর একটা আন্তরিক ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধ যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে।

অমিতাভ এল সাতটায়। ওকে দেখে চমকে গেল দিব্বেন্দু। অমিতাভর ফর্সা রং তামাটে হয়ে গেছে, মুখে কালো ছোপ পড়েছে। সত্যিকারের সুপুরুষ ছিল অমিতাভ, ফিটফাট পোশাকে আরও সুদর্শন দেখাত। সেই মানুষটার চেহারাই শুধু বদলে যায়নি — পোশাকের পারিপাট্যও ঘুচেছে। ঢিলেঢালা পোশাক এখানে-ওখানে কুঁচকে আছে। সব মিলিয়ে আট বছর আগেকার অমিতাভর এ যেন এক ম্লান ছায়া।

অমিতাভই প্রথম কথা বলল। একটা চেয়ার টেনে দিব্বেন্দুর মুখোমুখি বসতে বসতে বলল, "কতক্ষণ?"

"এই মিনিট পনেরো।"

"আমারই একটু দেরি হয়ে গেল। জ্যামে পড়ে গিয়েছিলাম। আচ্ছা, খুব রেগে আছিস আমার উপর — যোগাযোগ রাখিনি বলে? আসলে তখন আমার মনের অবস্থা একেবারেই ভালো ছিল না রে। যাই হোক, আমার খুব অন্যায় হয়ে গেছে। তুই আমাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দে।"

বন্ধুকে দেখেই রাগ-অভিমান সব গলে জল হয়ে গিয়েছিল দিব্বেন্দুর। ওর কথার ধরনে দিব্বেন্দু হেসে ফেলল। বলল, "ওসব কথা থাক। আট বছর পরে তোর সঙ্গে দেখা — কী যে ভালো লাগছে! কেমন আছিস বল। দাঁড়া, তার আগে কিছু খাবার দিতে বলি।"

একজন ওয়েটারকে ডেকে অমিতাভ খাবার অর্ডার দিল — দিব্বেন্দুর জন্যই বেশি, নিজের জন্য সামান্য।

"আমার অগ্নিমান্দ্য রোগ হয়েছে। একদম খিদে হয় না।"

"ধুর! চিকিৎসা করলেই সেরে যাবে। কোনো ডাক্তার দেখাচ্ছিস? শোন, আমার এক চেনা ডাক্তার—"

"সারানো কোনো ডাক্তারের কর্ম নয় রে। সে ব্যাপারেই তোর সঙ্গে পরামর্শ করতে চাই। তুই আমার একমাত্র বন্ধু। তুই যদি আমাকে সাহায্য না করিস তবে—"

"কী আবোলতাবোল বকছিস? তোর দরকারে আমি পাশে থাকব না — এমন চিন্তা তোর মাথায় এল কেমন করে বলত?"

"যাক, আমি নিশ্চিন্ত হলাম।" অমিতাভর মুখে ফুটে উঠল একটা স্বস্তির ছায়া। "আমার কাহিনী শুরু করার আগে একটা কথা জিজ্ঞেস করি — বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর নাম তুই শুনেছিস?"

"বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী? হ্যাঁ, কিছুদিন আগে খবরের কাগজে এই নামটা নিয়ে খুব সরগোল উঠেছিল। ভদ্রলোক নাকি দৈবশক্তি অর্জন করেছেন। একটা ক্রিমিনাল কেসেও জড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। যে পুলিশ অফিসারের হাতে কেসটা ছিল, ওই মামলার পর হঠাৎ তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিল পঁয়ত্রিশ। ডাক্তারি মতে হার্ট ফেইলিয়ার। তুই কি সেই ভদ্রলোকের কথা বলছিস?"

"হ্যাঁ। ভালোই হলো, ব্যাকগ্রাউন্ডটা তোর জানাই আছে — আমাকে নতুন করে বলতে হবে না। বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী আমার জীবন একেবারে বিষময় করে তুলেছে, দিব্বেন্দু। তুই শুনলে অবাক হবি — তিন মাস সে পলাশপুরে আমার ওখানে ছিল।"

"সে কী? কেন?" দিব্বেন্দু অবাক না হয়ে পারে না।

ওয়েটার টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়েছিল। একটা চামচ নিয়ে নিজের প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে অমিতাভ শুরু করল।

"বাবা আর পিসিমাকে হারিয়ে আমি ভীষণ আঘাত পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল জীবনে আর কোনো অবলম্বন নেই। বাবা যা টাকাপয়সা রেখে গিয়েছিলেন তা আমার পক্ষে শুধু পর্যাপ্তই নয়, অপ্রতুলও নয়। কিন্তু এই নিশ্চিন্ত আরামের জীবনে কেমন একটা বিতৃষ্ণা এল। বেরিয়ে পড়লাম। নানান তীর্থে ঘুরলাম। কিন্তু কিছুতেই মনের শান্তি পেলাম না। গত আট বছর ক্ষ্যাপার মতো আমি পরশপাথর খুঁজে বেরিয়েছি — আমার পরশপাথরটা অবশ্য মনের শান্তি। সাধু-সন্ন্যাসীদের চেলাগিরি থেকে কী না আমি করেছি। কিন্তু শান্তি কিছুতেই পেলাম না।"

"দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেল। শেষের দু বছর আমি পুরিতে ছিলাম। কিন্তু সমুদ্র আমাকে শান্তি দিতে পারল না। একদিন অমাবস্যার রাতে নির্জন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমি ভাবছিলাম — জীবনে ইতি টানলে কেমন হয়? হঠাৎ সেই ইচ্ছেটা আমার মধ্যে প্রবল হয়ে দেখা দিল। হয়তো আরেকটু হলেই সমুদ্রে ঝাঁপ দিতাম। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁধে একজনের স্পর্শে আমি চমকে উঠলাম।"

"'এভাবে জীবন শেষ করলেই কি শান্তি পাবেন?' পাশ থেকে সেই একজন বলে উঠল। 'নরকযন্ত্রণা সম্বন্ধে কোনো ধারণা আছে আপনার? আত্মহত্যা করলে সেখানে গিয়েই তো পৌঁছাতে হবে।' সেই ভদ্রলোকই হলেন বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী।"

"তিনি আমার সঙ্গে আমার হোটেলে গেলেন। আমি নিজের মধ্যে ভীষণ একটা পরিবর্তন অনুভব করতে লাগলাম। বিরূপাক্ষর উপস্থিতি আর সান্নিধ্য আমাকে যেন কেমন আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনের অবসাদ, অশান্তি যেন জাদুমন্ত্রবলে দূর হয়ে গেল। আমি যে আত্মহত্যার কথা ভাবছিলাম, তা ভদ্রলোক কেমন করে বুঝতে পারলেন — সে কথা ভেবেও আশ্চর্য হলাম।"

"হুম। ভদ্রলোক নিশ্চয়ই সম্মোহনবিদ্যা জানেন। তাই তো ওর মনের অস্থিরতা বুঝতে উনার কোনো অসুবিধা হয়নি।"

"শুধু সম্মোহনবিদ্যা হলে তো কথা ছিল না। আমার ধারণা লোকটার উপর শয়তান ভর করেছে — কিংবা সে শয়তানের দূত। যাক সে কথা। বিরূপাক্ষ পরদিনই হোটেলে আমার ঘরে এসে উঠলেন। আমি কোনো আপত্তি করলাম না — উঠতে পারলাম না।"

"বিশ্বাস করবে, ভদ্রলোকের আচরণে আর কথাবার্তায় এতটুকু খুঁত আমার চোখে পড়েনি। বরং আমার মন কেমন যেন হালকা হতে শুরু করল। ভদ্রলোকের বাকপটুতা অসাধারণ — দর্শন, ইতিহাস, ধর্ম, সামাজিক সমস্যা — সবকিছুর উপর তাঁর অগাধ দখল। শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করার মতো আশ্চর্য ক্ষমতা ভদ্রলোকের। অদ্ভুত আকর্ষণীশক্তি।"

"বিরূপাক্ষর সব খরচ আমি মিটিয়ে দিচ্ছিলাম। ওর হাবভাবে মনে হত ওটা যেন তাঁর ন্যায়সঙ্গত দাবি। তবে মিথ্যে বলব না — ওর সান্নিধ্য এবং কথাবার্তার গুণে আমি আবার নিজের পুরনো সত্তা ফিরে পাচ্ছিলাম। মনের সমস্ত অবসাদ যেন ঝড়ো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে উড়ে যাচ্ছিল।"

"তারপর একসময় আমি পলাশপুর ফিরলাম। সঙ্গে এলেন বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী। বিরূপাক্ষ বেশ জাঁকিয়েই বসেছিলেন। প্রয়োজনমতো আমার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতেন। তবে একসঙ্গে বেশি কখনো নেননি।"

"তারপরেই আমি প্রথম হোঁচট খেলাম। দর্জি থেকে শুরু করে নানান দোকান থেকে আমার কাছে মোটা বিল আসতে শুরু করল — সবই বিরূপাক্ষর সৌজন্যে। ইতিমধ্যে আমি তাঁর প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি এবং অনেকটা সফলও হয়েছি। ঠিক এমন সময় আমার ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে একবার দেখা করতে অনুরোধ করলেন।"

"আমি গেলাম। ম্যানেজার একটু সংকোচের সঙ্গে জানালেন, সাম্প্রতিক আমার কয়েকটা চেকের সই সম্বন্ধে তাঁর মনে সামান্য সন্দেহ জেগেছিল। কিন্তু আমি একজন পুরনো ক্লায়েন্ট, তাই তিনি চেকগুলো বাতিল করেননি। তিনি আমাকে কার্ডে নতুন কয়েকটা সই করতে অনুরোধ করলেন।"

"পরে যে চেকগুলো সম্বন্ধে ম্যানেজারের সন্দেহ হয়েছিল, তার একটা আমি দেখতে চাইলাম। তিনদিন আগের একটা চেক ম্যানেজার আমার হাতে তুলে দিলেন। টাকার অঙ্কটা বেশি নয়, একশো টাকা। সইটা আমার মতোই — তবে আমার নয়। কারণ তিনদিন আগে আমি কোনো চেক কাটিনি। বিরূপাক্ষই যে আমার সই জাল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলছেন, সে বিষয়ে আমার আর কোনো সন্দেহ রইল না।"

"বিরূপাক্ষ একসঙ্গে কখনো মোটা টাকা তোলেননি — অল্প টাকা, এবং আমার মতো একজন দামি ক্লায়েন্ট। তাই ব্যাংক ম্যানেজার চেক ফেরত দিতে দ্বিধা করবেন — এই মনস্তত্ত্বের উপর তিনি নির্ভর করেছিলেন। আমি উপলব্ধি করলাম, ভদ্রলোকের কবল থেকে এবার আমার মুক্তি পাওয়া দরকার।"

"এর আরও দুটি কারণ অবশ্য ছিল। তুই তো জানিস আমাদের বাড়িতে ঝি-চাকরের সংখ্যা কম নয় — অনেকদিন ধরে সবাই আছে, আমি তাদের কাউকে ছাড়াইনি। ওরা গরিব মানুষ আর আমার টাকার অভাব নেই, তাই যে যেমন ছিল আছে। আমি লক্ষ করলাম, বিরূপাক্ষ তাদের উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছেন — যেন তিনিই বাড়ির কর্তা আর তারা তাঁর হুকুমের দাস।"

"দ্বিতীয় যে ঘটনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, তা হলো — বিরূপাক্ষকে প্রায়ই দেখতাম পুরনো কিছু পুঁথি নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকতেন। আমি একদিন কৌতূহলী হয়ে একটা বই উল্টেপাল্টে দেখছিলাম। তালপাতার পুঁথি। পুঁথির মলাটের উপর নীল কালিতে মোটা অক্ষরে লেখা — 'প্রেতসিদ্ধের গুপ্ত মন্ত্র'। আর একটা বিবর্ণ ছবি — বিবর্ণ হলেও ভয়াবহ। একটা মূর্তি, লম্বা লম্বা দুটো হাত বাড়িয়ে সামান্য ঝুঁকে রয়েছে, যেন কাউকে অনুসরণ করছে। তার দুচোখে হিংস্র দৃষ্টি, মাথায় দুটো শিং, গায়ে কালো আলখাল্লার মতো পোশাক। ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমি শিউরে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল শয়তানিতে ভরা দুটো জীবন্ত চোখ যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছে।"

"পুরো বইটা পালিতে লেখা। পাতায় পাতায় শ্লোক। পালি আমি অল্প অল্প জানি, কিন্তু ওই পুঁথির পাঠোদ্ধার আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবে একটা কথা বুঝেছিলাম — ওই শ্লোকগুলো কোনো দেবতার উদ্দেশ্যে নয়, বরং শয়তানের উদ্দেশ্যে বলেই আমার মনে হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বইটা হাতে নিয়েই আমার সমস্ত শরীরে কেমন যেন একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলো।"

"যাই হোক, ব্যাংকের ব্যাপার নিয়ে বিরূপাক্ষর সঙ্গে আমি কথা বললাম। তাঁকে জানালাম এ ঘটনার পর আমার বাড়িতে তাঁকে আমি আর থাকতে দিতে পারি না। বিরূপাক্ষ আমার কথা চুপ করে শুনলেন, কোনো প্রতিবাদ করলেন না। পরদিন সকালেই তিনি আমার বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।"

"তবে একটা কথা আমি স্বীকার করব — আমার অশান্ত মনে তিনিই শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাঁর মধ্যে অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আমি অনুভব না করে পারিনি। যাওয়ার আগে আমার কপাল স্পর্শ করে ভদ্রলোক কিছু মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, আমার মনে আবার যাতে অশান্তি না আসে তার জন্য প্রার্থনা করলেন।"

"কিন্তু, দিব্বেন্দু, এ ঘটনার দিন পনেরো পরে আমি তাঁর কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। তিনি লিখেছিলেন, মাসখানেকের জন্য তিনি কলকাতার বাইরে যাচ্ছেন। ওই চিঠির সঙ্গে আরও একটা কাগজ ছিল। কাগজে আঁকা একটা ছবির ধার ঘেঁষে কাঁচি দিয়ে কাটলে যেমনটি হয়, তেমন এক ছবির নকশা। ছবিটা একটা মূর্তির — তালপাতার পুঁথির মলাটে যে ভয়াবহ ছবি ছিল, সেই ছবির নকল। তবে আরও স্পষ্ট এবং বীভৎসভাবে রং করা।"

"বিরূপাক্ষর চিঠিতে লিখেছিলেন, ওই ছবিটা খুব শক্তিশালী এক পুরুষের ভাবরূপ। আমার ছন্নছাড়া জীবন সুসংহত করতে ওই ছবিটা খুব সাহায্য করবে। ওটা কপালে ঠেকিয়ে একটা মন্ত্র উচ্চারণ করতে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।"

"বিশ্বাস কর, আমার নিজের শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রেরণায় ওটা আমি কপালে ঠেকিয়ে মন্ত্রটা উচ্চারণ করেছিলাম। কী সেই মন্ত্র? সেও এক অদ্ভুত ব্যাপার — আমি ওটা পরে কিছুতেই মনে করতে পারিনি। ওই কাটা কাগজের নকশাটাও পরদিন আমি খুঁজে পাইনি। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওটা আমি আমার ডায়রির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম।"

"তারপর থেকেই অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে।" অমিতাভ যেন দম নেওয়ার জন্য একটু থামল।

"অদ্ভুত মানে কী অদ্ভুত ঘটনা?"

"সেই রাত থেকেই অন্ধকারে আনাচেকানাচে আমি অস্পষ্ট সব ছায়ামূর্তি দেখছি। ঘরে, বাগানে, রাস্তায় — সর্বত্র ওরা যেন আমাকে অনুসরণ করছে, কিংবা অন্ধকারের আড়াল থেকে আমার উপর লক্ষ রাখছে। বিরূপাক্ষ যে ছবির নকশাটা পাঠিয়েছিলেন, ছায়ামূর্তিগুলো তার অবিকল সংস্করণ। এককথায় ভয়াবহ। যতই দিন যাচ্ছে ছায়াগুলো ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আচমকা ওরা এসে হাজির হয়। কখন, কোথা থেকে আসবে তা আগে থেকে বোঝার উপায় নেই। তবে রাত্রির দিকেই তাদের বেশি দেখা যায়। একটা অদ্ভুত ভয়াবহ পরিবেশের মধ্যে আমি বাস করছি।"

"দিব্য, কতদিন ধরে ঘটনা ঘটছে?"

"আগামীকাল এক মাস পূর্ণ হবে। তুই নিশ্চয়ই ভাবছিস আমার মাথাটা ঠিক নেই।"

"না, তা মনে করছি না। তোর মাথা ঠিকই আছে। কিন্তু তুই ওখান থেকে চলে আয় না — আমার এখানে থাকতে তোর আপত্তি হওয়ার কোনো কারণ নেই।"

"তোর বাড়িতে ওই অভিশপ্ত ছায়াগুলোকে টেনে আনতে বলছিস? না না, তা হয় না, দিব্য। তাছাড়া আমি অন্যখানে গিয়েও দেখেছি — ওরা আমাকে ছাড়ে না। যেখানেই যাই, ওরা আমার অনুসরণ করবেই।"

"এজন্যই কি তোর খাওয়াদাওয়ার রুচি নেই?"

"চোখেও ঘুম নেই। আমি আর পারছি না।"

একটা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে যে অমিতাভর দিন কাটছে, তা বুঝতে দিব্বেন্দুর কষ্ট হলো না। তবে খারাপ লাগল অমিতাভর জন্য — আগে যদি একবার জানতো যে তার বন্ধু এত কষ্টে আছে।

"তুই কোনো চিন্তা করিস না, অমিতাভ। আমি তোর পাশে আছি। এবার থেকে বিরূপাক্ষকে দুজনের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।"

"তুই আমাকে বাঁচালি ভাই! কীভাবে যে আমার দিন কাটছে... দিনের বেলা সূর্যের আলো, মানুষজন, গাড়িঘোড়া — যেন এক আলাদা জগৎ। কিন্তু সন্ধের পর থেকে শুরু হয় বিভীষিকার রাজত্ব।"

"তাহলে ব্যাপারটা হলো — বিরূপাক্ষ সেই ছবি পাঠাবার পর থেকেই তুই সেই ছবির হুবহু ছায়া দেখতে শুরু করেছিস। তাই তো? আচ্ছা এটা তো হতে পারে যে ভদ্রলোক সম্মোহনবিদ্যায় পারদর্শী — তোকে সম্মোহিত করে ভয় দেখাচ্ছেন।"

"তা হতে পারে। কিন্তু ওর হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পথ আমি খুঁজে পাচ্ছি না, দিব্য।"

"শোন, শোন অমিতাভ — পথ পাওয়া যাবেই। কেউ যদি একটা বাঁধন দিতে পারে, অন্য কেউ সেটা খুলতে পারবেই।"

"দিব্য, আজ আমার সঙ্গে তুই পলাশপুর যাবি?"

এখন? দিব্বেন্দু অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।

"হ্যাঁ। গাড়িতে ঘণ্টা তিনেক লাগবে। এখন রওনা হলে রাত বারোটার আগেই পৌঁছে যাব। আমি রোজ রাতে ওই সময় আমার বাগানে ওই ছায়ামূর্তিগুলোকে নড়াচড়া করতে দেখি। তোকে আমি দেখাতে চাই — আমি সত্যি দেখছি, না আমার দৃষ্টিভ্রম, তা আজ পরীক্ষা হয়ে যাক। কী বলিস?"

"বেশ, আমি রাজি। তবে আমাকে একবার বাড়ি হয়ে যেতে হবে। অফিসের ব্যাপারে কয়েকটা ফোনও করতে হবে।"

"বেশ, ঠিক আছে। তবে চল, এখুনি ওঠা যাক।"

কথা শেষ করেই অমিতাভ আচমকা মুখ তুলে উত্তর দিকের দেওয়ালের দিকে তাকাল। দিব্বেন্দুর মনে হলো সেই মুহূর্তে হঠাৎ যেন রেস্তোরাঁয় একটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কারো মুখে কথা নেই। রেস্তোরাঁর প্রকান্ড হলঘরের সব আলো ক্ষণিকের জন্য কমে এল — দপদপ করতে শুরু করল, এই বুঝি লোডশেডিং হয়। আর ঠিক তক্ষুনি উত্তর দিকের দেওয়াল ঘেঁষে একটা ছায়ামূর্তি যেন নড়েচড়ে মিলিয়ে গেল। ছায়া — ছবির পর্দায় কখনো কখনো ছবি যেমন কাঁপতে থাকে, ঢেউয়ের তরঙ্গ তোলে — অনেকটা তেমন অনুভূতি হলো দিব্বেন্দুর।

অমিতাভর দিকে চোখ ফিরিয়ে দেখল অমিতাভ স্থির দৃষ্টিতে ওইদিকে তাকিয়ে আছে।

গাড়িতে ওদের মধ্যে খুব কমই কথা হলো। ঘুরে ফিরে একটা কথাই দিব্বেন্দুর মনে হতে লাগল — অমিতাভর মাথা খারাপ হয়নি, কিন্তু ওর মনের অবস্থা ঠিক স্বাভাবিক নয়। ও বরাবরই ভাবপ্রবণ। তার উপর ওই মস্ত বাড়িতে একা নিঃসঙ্গ জীবন, আহারে অরুচি — সব মিলিয়ে ওকে নার্ভাস ব্রেকডাউনের মুখে ঠেলে নিয়ে চলেছে। বিরূপাক্ষ লোকটা যে একটা আস্ত শয়তান সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সে তার অশুভ প্রভাব ঘটাচ্ছে অমিতাভর উপর।

"বিরূপাক্ষ কবে ফিরছেন? কোথায় থাকেন ভদ্রলোক, জানিস?"

"কালীঘাটে। তবে বেশিরভাগ দিন সন্ধের পর চেতলায় একটা ক্লাবে যান, অনেক রাত পর্যন্ত থাকেন। সেই ক্লাবের সব মেম্বারই নাকি পারলৌকিক এবং আধিভৌতিক ব্যাপার নিয়ে চর্চা করে। ঠিকানাটা হল — চেতলা অগ্রণী ক্লাব। ওখান থেকে তুই সোজা যাচ্ছিস, ক্লাবটাকে ডান হাতে রেখে।"

দিব্বেন্দু ক্লাবের ঠিকানাটা নিজের ডায়রিতে টুকে নিল।

"আচ্ছা, আমার সঙ্গে তোর পরিচয়ের কথা ভদ্রলোক জানেন কি?"

"না।"

"ভালোই হলো।"

"কেন?"

"ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি নিজে আলাপ করব।"

"দিপু, সাবধান। অন্যের উপর প্রভাব খাটাবার আশ্চর্য ক্ষমতা ওই বিরূপাক্ষর। একজন সাংঘাতিক মানুষ। আমার মতো তুইও ওর খপ্পরে পড়িস — তা আমি চাই না ভাই।"

"না না, চিন্তা করিস না। আমি সাবধান থাকব।"

সাড়ে দশটার মধ্যেই অমিতাভর গাড়ি পলাশপুরের দত্তকুঠিতে পৌঁছে গেল। সেই ছোটবেলায় এসেছিল দিব্বেন্দু, আর আজ এত বছর পর আবার এলো। কত স্মৃতি, কত মুহূর্ত।

রাত্রিরে দুজনের কেউই আর কিছু খেল না। ওরা দোতলায় শোবার ঘরে গিয়ে বসল। অমিতাভ ঘন ঘন হাতঘড়ি দেখছিল, যেন কিছু একটার অপেক্ষা করছে। দিব্বেন্দু সেটা লক্ষ করছে দেখে কৈফিয়তের সুরে অমিতাভ বলল, "আসলে রাত বাজলে বাগানে — এই ঘরের উত্তর দিকের জানলার ঠিক নিচে — একটা ছায়ামূর্তি ঘোরাফেরা করে। আমি বুঝতে পারি আমাকে ওটা যেন টানে, জানলার কাছে টেনে নিয়ে যায়।"

"তুই ঘাবড়াচ্ছিস কেন, অমিতাভ? আমি তো রয়েছি। আসুক না ওটা, আমি ওটাকে বরাবরের জন্য তাড়িয়ে তবে ছাড়ব। এই শোন না, তোর মনে আছে, ওই বাগানে একবার সাইকেল চালাতে গিয়ে তুই—"

"চুপ চুপ! কর।" হঠাৎ অমিতাভর সমস্ত শরীর যেন শক্ত হয়ে গেল। দুচোখে বিস্ফারিত দৃষ্টি। "ওটা এসেছে। আমি জানি ওটা এসেছে।"

"অমিতাভ, শান্ত হও। কোথায়?"

"বাগানে — জানলার নিচে।"

অমিতাভ ছুটে গেল, দিব্বেন্দু ওর পাশে দাঁড়াল। তক্ষুনি একটা ছায়ামূর্তি ওর চোখে পড়ল — দুটো হাত উপরে তুলে ওটা যেন আহ্বান জানাচ্ছে। ওর পাশে অমিতাভর সমস্ত শরীর কাঁপছে আর ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। মূর্তিটা আজ সম্পূর্ণ স্পষ্ট।

"অমিতাভ! চল, আমরা নিচে গিয়ে ওকে ধরব। আজ একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব। চল!"

কথাটা বলে দিব্বেন্দু ছুটল। পেছন পেছন অমিতাভ। সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এল ওরা। বসবার ঘরে ঢুকে বাইরে বাগানে যাওয়ার দরজার ছিটকিনিটা খুলতে গিয়েই বাধা পেল দিব্বেন্দু। ওটা কেন যেন আটকে গেছে।

"সর, আমি খুলছি।" দিব্বেন্দুকে সরিয়ে দিয়ে অমিতাভ এগিয়ে গেল। কী একটা কৌশলে ছিটকিনিটা খুলে দরজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল অমিতাভ। দিব্বেন্দু বেরোতে গিয়ে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। সেই অবস্থায় দিব্বেন্দু দেখল — অমিতাভ তার দুহাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা বিকট ছায়ামূর্তি — মাথায় দুটো শিং, গায়ে কালো আলখাল্লা — ওকে ঢেকে ফেলছে। মূর্তির ভাবভঙ্গি হিংস্র। সেটা যেন আস্তে আস্তে গিলে খাচ্ছে অমিতাভকে।

পরমুহূর্তেই একটা আছড়ে পড়ার মতো শব্দে মাটিতে পড়ে গেল অমিতাভ। পড়িমড়ি করে উঠে ছুটল সেদিকে।

"কেউ আছেন? কেউ আছো এখানে? এসো! কেউ আছো?"

ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন, হার্ট ফেল করে অমিতাভর মৃত্যু হয়েছে।

দিব্বেন্দু জানে, যা আসলে ঘটেছে সেটা সে কাউকে বললে কেউ তাকে বিশ্বাস করবে না। চোখ খুলে মাটিতে পড়ে আছে অমিতাভর শীতল দেহ। একটা জিনিস কিন্তু সবার কাছেই আশ্চর্য মনে হলো — অমিতাভর চোখের মণি দুটো আর গোল দেখাচ্ছিল না, দেখাচ্ছিল অনেকটা যেন আধখানা চাঁদের মতো।

ওই ঘটনার দুদিন পরেই পরলোকচর্চা ক্লাবে ফোন করে দিব্বেন্দু জানতে পারল বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী কলকাতায় ফিরেছেন। দিব্বেন্দু হিসেব করে দেখল, ওই মর্মান্তিক ঘটনার দিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন।

অনেক ভেবেচিন্তে শেষমেষ সেদিন সন্ধেবেলা বিষ্ণু শর্মার দ্বারস্থ হলো দিব্বেন্দু।

বিষ্ণু শর্মা একজন নামকরা তান্ত্রিক। লোকে বলে তিনি নাকি অসাধ্য সাধন করতে পারেন, প্রচন্ড ক্ষমতাধারী। কিন্তু নিজেকে জাহির করবার এতটুকু চেষ্টা তাঁর নেই। ভবানীপুরে গঙ্গার তীরে একটা ছোট্ট বাড়িতে তিনি পূজোআর্চা নিয়ে থাকেন। ভক্তরা আসে, প্রণামী দেয় — এভাবেই তাঁর দিন কাটে।

দিব্বেন্দু চাকরি ছেড়ে নিজের ব্যবসা শুরু করার আগে এক বন্ধুর পরামর্শে ওর মতামত নিতে এসেছিল। তিনি ওর কোষ্ঠী বিচার করে নিঃসংশয় চিত্তে ওকে এগিয়ে যেতে বলেছিলেন। আরও একটা কথা তিনি বলেছিলেন — বছরখানিকের মধ্যে কিংবা তার কিছু পরে দিব্বেন্দুর এক পরমাত্মীয়র দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু ঘটবে। এবং সেই সূত্রে দিব্বেন্দুর জীবনেও এক টুকরো কালো মেঘ দেখা দেবে। তবে তা কেটে যাবে বলেই তাঁর ধারণা।

"এটে রেখো।" দিব্বেন্দুকে তিনি একটা মাদুলি দিয়েছিলেন। অন্তত সেই সময়টা পার না হওয়া পর্যন্ত সে যেন মাদুলিটা গায়ে রাখে। দিব্বেন্দু মাদুলিটা ডান হাতের বাহুতে বেঁধেছিল।

এরপর থেকে মাঝে মাঝেই ও শর্মাজীর কাছে যেত, কিছু টাকা ওর হাতে দিয়ে আসত। বিষ্ণু শর্মার জ্ঞানের গভীরতায় ও মুগ্ধ না হয়ে পারেনি।

বিষ্ণু শর্মার কথাটা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। অমিতাভ ওর রক্তের সম্পর্ক না হলেও নিজের ভাইয়ের চাইতেও বেশি ছিল — পরমাত্মীয় তো বটেই। আর কেউ না জানলেও দিব্বেন্দু জানে অমিতাভর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই। অকাল মৃত্যুও বটে।

বিরূপাক্ষর সঙ্গে মোকাবিলা ওকে করতে হবে। সে ব্যাপারে বিষ্ণু শর্মার সাহায্যের প্রয়োজন। উনি একজন তান্ত্রিক — হয়তো আটঘাট বলে দিতে পারবেন।

দিব্বেন্দুর ভাগ্য ভালো, ঘরে তখন অন্য কেউ ছিল না। শর্মাজি ওকে দেখে স্নেহের হাসি হাসলেন। উদ্যোগী যুবকটিকে তিনি স্নেহের চোখেই দেখেন।

"এসো, বসো। বল, কী খবর?"

"খবরের জন্যই আপনার কাছে এসেছি। দুটো খবর। প্রথম — বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর নাম কি আপনি শুনেছেন? দ্বিতীয় — কারো ক্ষতি করবার উদ্দেশ্যে নকশা কাটা, মানে বীভৎস এক মূর্তি আঁকা কাগজ — অবিকল ওই ধাঁচে কেটে কাউকে পাঠাবার কোনো রীতি আছে কি?"

বিষ্ণু শর্মার মুখ গম্ভীর হলো, কপালে ভাঁজ পড়ল। "তোমার দুটো প্রশ্নেরই উত্তর আমার জানা আছে। এবং তোমাকে আমি এই পরামর্শই দেব যে, কোনোমতেই ওই দুটির কোনোটার সঙ্গেই নিজেকে জড়িও না। শুধু বিপদজনক বললে ছোট করে বলা হবে।"

"দুঃখের বিষয়, আমি জড়িয়ে পড়েছি। এখন আর ফিরে আসার কোনো পথ নেই। দুদিন আগে আমার এক প্রাণের বন্ধু মারা গেছে। সে ঘটনায় পরে আসছি। তার আগে বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী সম্বন্ধে আপনি যা জানেন আমাকে বলুন।"

"উনি প্রচন্ড ক্ষমতার অধিকারী। আধ্যাত্মিক না — বরং বলা উচিত আধিভৌতিক ক্রিয়াকর্মে উনি খুব উচ্চমার্গে উঠেছেন। শুনেছি এজন্য তিনি নানা জায়গায় ঘুরেছেন, তিব্বতীয় গুরুর কাছে পাঠ নিয়েছেন। জাদুবিদ্যা, ডাকিনীবিদ্যা এসব চর্চা করেছেন। এখন নাকি তিনি শয়তানের উপাসক হয়ে একটা সংঘ গড়েছেন। এককথায়, অশুভ শক্তি নিয়েই ভদ্রলোকের চর্চা।"

"ওই বিরূপাক্ষ মেরেছে আমার বন্ধুকে। আমি আলাপ করতে চাই ওর সঙ্গে।"

"বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী আধিভৌতিক বিষয়ে কয়েকটা বই লিখেছেন। আমার কাছে গোটাচারেক আছে, তোমাকে দিচ্ছি — মন দিয়ে পড়বে। মঙ্গলবার আর শনিবার সন্ধে সাতটায় আমার কাছে আসবে। আমি তোমাকে খুব দরকারি কয়েকটা ক্রিয়াকলাপ আর মন্ত্র শিখিয়ে দেব। আমি নিজেও তোমার মঙ্গলের জন্য মা কালীর কাছে রোজ পূজো দেব। যতদিন না তুমি যোগ্য হয়ে উঠছো, এ ব্যাপারে একেবারে এগোবে না। এটা আমার সাবধানবাণী নয় — আমার অনুরোধ। ভালো কথা, আমি যে কবচটা দিয়েছিলাম সেটা হাতে আছে তো?"

দিব্বেন্দু জামার আস্তিন গুটিয়ে দেখাল। বিষ্ণু শর্মা দুচোখ বুজে বিড়বিড় করে কী যেন মন্ত্র পড়লেন। তারপর কালীমূর্তির পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা জবাফুল হাতে নিয়ে তিনবার সেটা দিব্বেন্দুর কপালে ঠেকালেন।

"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনি তো সবই শুনলেন। এমন একজন অদ্ভুত মানুষ সমাজের বুকে খুশিমতো হেঁটে চলে বেড়াবে, যখন যাকে ইচ্ছে নিজের বশে আনবে, তার উপর অসন্তুষ্ট হলে মর্মান্তিক প্রতিশোধ নেবে — আমি বরদাস্ত করতে পারছি না। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব, গুরুদেব। এ ব্যাপারে আপনি আমার প্রধান ভরসা।"

"মঙ্গল হোক তোমার।"

ফার্মের অপর দুজন পার্টনারের সঙ্গে দিব্বেন্দু কথা বলল — মাস দুই ও একটা ব্যক্তিগত জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকবে। তাই খুব দরকারি নথিপত্র ছাড়া আর কোনো কাগজ যেন ওকে না দেওয়া হয়। নিয়মিত অফিসে আসাও ওর পক্ষে হয়তো সম্ভব হবে না।

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর বই ছাড়াও আরও কয়েকটা বইয়ের তালিকা করে দিয়েছিলেন বিষ্ণু শর্মা — কোথায় পাওয়া যাবে তাও বলে দিয়েছিলেন। এইসব বই নিয়ে পরিশ্রমী ছাত্রের মতো পড়াশোনা আরম্ভ করল দিব্বেন্দু। লেখাপড়ায়ও বরাবরই ভালো ছিল। নতুন একটা বিষয় পেয়ে ও যেন মেতে উঠল। কোনো কোনো দিন রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যেত। শুধু পড়াই নয়, খুঁটিনাটি তথ্য একটা খাতায় টুকে রাখারও বিরাম ছিল না।

এদিকে নিয়ম করে মঙ্গল আর শনিবার বিষ্ণু শর্মার কাছে পাঠ নেওয়াও চলছিল। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। নিজের অজান্তেই যেন আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছিল দিব্বেন্দু। অলৌকিক জগতের সব দরজা খুলে যাচ্ছিল ওর কাছে।

তিন সপ্তাহ পরে বিষ্ণু শর্মা বললেন, "এবার তোমাকে ছাড়তে পারি। তোমার মতো এমন নিষ্ঠাবান ছাত্র আর আমার চোখে পড়েনি। তুমি এসব ব্যাপার নিয়ে চর্চা করলে একজন সিদ্ধপুরুষ হতে পারতে। এখন তোমার কার্যসিদ্ধি হোক, এই প্রার্থনাই করি। মনে রেখো, আমি সর্বদা তোমার পেছনে আছি।"

দিব্বেন্দু বিষ্ণু শর্মার বাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। নিজেকে অদ্ভুত শক্তিশালী লাগছে ওর। অমিতাভর মুখটা মনে পড়তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এল দিব্বেন্দুর।

সেদিন সন্ধেবেলা চেতলায় একটা পুরনো বাড়ির সদর দরজায় দিব্বেন্দুকে দেখা গেল। ওই বাড়ির একটা বড় ঘরে বিরূপাক্ষদের সভা বসে। বাড়ির মালিক নিজেও ওই সংঘের একজন সক্রিয় সদস্য। দিব্বেন্দু ভেতরে খবর পাঠাল — বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর সঙ্গে সে দেখা করতে চায়। মিনিটখানিক পরেই ওকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো।

একটা বড় হলঘরে স্থিমিত আলোয় একটা মস্ত গোল টেবিলের চারপাশে জনাদশেক ভদ্রলোক ঘন হয়ে বসে আছেন। ঘরের মধ্যে একটা উৎকট নিস্তব্ধতা।

দিব্বেন্দু ঘরে ঢুকতেই একজন ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে ওকে ডেকে এক কোণায় নিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন। দিব্বেন্দুকেও বসতে অনুরোধ করলেন।

"বসুন।"

"নমস্কার। আপনি...?"

"যার নাম নিয়ে বললেন, যাকে দেখা করতে এসেছেন — অধমের নাম বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী।"

এরপর দিব্বেন্দু যতদিন বেঁচে ছিল, প্রথম সাক্ষাতের সেই অনুভূতি তার মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। অসুরের মতো চেহারা — লম্বায় ছয় ফুটের উপর, প্রশস্ত বক্ষ, পেশাদার মল্লবীরের মতো বলিষ্ঠ চেহারা। মিশমিশে কালো গায়ের রং, মাথা ভর্তি ঢেউ খেলানো বাদামি চুল, পুরু ঠোঁট, বাঁকানো নাক, ঘন যুগ্ম ভুরু — দুচোখে একটা ক্রুর সাপের দৃষ্টি। দিব্বেন্দু অনুভব করল সে একটা প্রচন্ড শক্তির সম্মুখীন হয়েছে। নিজেকেও যথাসম্ভব প্রস্তুত করে নিল।

"আপনি কি পুলিশের লোক?" আশ্চর্য সুরেলা কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী। তাঁর কণ্ঠস্বরে প্রায় চমকে উঠল দিব্বেন্দু — এই কণ্ঠস্বরের মাদকতাই যে শ্রোতাকে মুগ্ধ করতে সাহায্য করে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

"না না, আমি পুলিশের লোক নই। তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই আমার নেই।"

"তাহলে ক্ষমা করবেন। মাঝে মাঝেই পুলিশ থেকে কেউ না কেউ এসে আমাকে উৎপাত করে কিনা, তাই প্রশ্নটা করেছিলাম। তা আপনার উদ্দেশ্যটা জানতে পারি কি?"

"না না, উদ্দেশ্য কিছু নেই। আসলে আমি আপনার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত। আপনার কয়েকটা বই আমি পড়েছি। অলৌকিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক ব্যাপারে আমারও সামান্য কৌতূহল আছে। আপনার বইগুলোতে সে সম্বন্ধে এমন সাবলীল ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে যে আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। বিশ্বাস করুন — আপনার জ্ঞানের গভীরতা আমার বিস্ময়ের সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম সন্ধেবেলা আপনাকে এখানে পাওয়া যাবে। তাই আপনাকে দর্শনের জন্যই আজ একটু—"

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী ওর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। তাঁকে কেমন যেন একটু বিভ্রান্ত মনে হলো। দিব্বেন্দুর কাছে এসে গলা নামিয়ে বললেন, "আপনার সম্বন্ধে আমি কৌতূহল বোধ করছি। কারণটা বলছি — আমার নিজস্ব একটা প্রথায় আমি নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি যার সঙ্গে আমি দেখা করছি, সে আমার শত্রু না মিত্র। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে আমার সেই শক্তিটা খাটেনি। সেটাই আমার কাছে আশ্চর্য লাগছে। আপনি কি পারলৌকিক ব্যাপারে অনেকদিন চর্চা করেছেন?"

"না তো? শুধু কিছু বই পড়া ছাড়া আর কিছুই করিনি কোনোদিন।"

"আশ্চর্য।" বিরূপাক্ষ স্বগত করলেন। "আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি আপনার একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত হিসেবেই এসেছি। অবশ্য আমি বুঝতে পারছি আপনার শত্রু আছে। দেখুন, সব বিখ্যাত মানুষেরই শত্রু থাকে — কেউ বড় হলেই তার শত্রু হয়, কিছুটা হিংসার বশেও বটে। আর আপনিও যে একজন বিখ্যাত এবং বড় মানুষ, সে বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আচ্ছা, আমার লেখা বই আপনি পড়েছেন বললেন — কোন বইটা আপনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে?"

দিব্বেন্দু বুঝতে পারল, এটা ওর পরীক্ষা।

"এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া সত্যিই শক্ত। আপনার 'পরলোকের কথা', 'প্রেততত্ত্ব', 'তন্ত্রমন্ত্র', 'শয়তানের জয়যাত্রা' — সবগুলো দারুণ। নতুন একটা চিন্তার জগৎ খুলে দিয়েছে জানেন? তবে আমার নিজের প্রিয় বই হচ্ছে শেষেরটা।"

"কোনটা?"

"'শয়তানের জয়যাত্রা'। ওটায় শয়তানের যেসব বন্দনাগীত উদ্ধৃত করেছেন, তা উদ্ধার করতে আপনাকে যে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। এই যেমন ধরুন, সেই শ্লোকটা — 'রিং রাং রাং জাগা আসনা ভয়ালুপেনা...'" দিব্বেন্দু বইটা থেকে শ্লোক মুখস্থ বলে যেতে লাগল।

"বাহ! আপনি তো খুব সুন্দর আবৃত্তি করেন।" দিব্বেন্দু থামতেই বিরূপাক্ষ প্রশংসার কণ্ঠে বলে উঠলেন। "আসল কথা কি জানেন, এসব চর্চা করতে গেলে প্রথমেই দরকার আত্মনিয়ন্ত্রণ। নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এ বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া যায় না, অন্যের মনেও প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হয় না। একদিন আপনাকে আমি আমার ক্ষমতার নমুনা দেখাব। আচ্ছা, এ ধরনের চর্চায় নৈতিকতাবোধের দরকার হয় না?"

হেসে উঠলেন বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী — অদ্ভুত সেই হাসি। "ঠিক তার উল্টো। আমরা যে দেবতার উপাসনা করি, ভগবানে বিশ্বাসী মানুষ তার নাম দিয়েছে শয়তান। সুতরাং ভগবানে বিশ্বাসী মানুষের কাছে যা কিছু ভ্রষ্ট বা নীতিহীন — আমাদের কাছে তাই গ্রহণযোগ্য।"

"আর প্রতিহিংসা?" দিব্বেন্দু কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল।

"আমাদের শাস্ত্রে ক্ষমা নামে কোনো কথা নেই। কেউ আমাদের সঙ্গে শত্রুতা করলে তার বদলা নেওয়াই আমাদের ধর্ম। আপনি ভুলে যাচ্ছেন — আমরা শয়তানের উপাসক।"

"না না, আমি তো শুধু জানতে চাইছিলাম। আচ্ছা, আপনি আপনাদের উপাস্য দেবতার উপর কোনো বই লেখেননি?"

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর দুচোখে যেন ঝিলিক খেলে গেল। "আপনি আমার মনের কথাই বলেছেন। এ বিষয়ে আমার একটি বই লেখার সারাজীবনের ইচ্ছে। অনেক তথ্য যোগাড়ও করে ফেলেছি। আচ্ছা, আপনার পরিচয় তো পেলাম না — নামধাম, পেশা?"

"আমি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। কিছুদিন হলো নিজের ফার্ম খুলেছি। নাম দিব্বেন্দু সরকার, আর ধাম গুড়িয়াহাটা রোড।"

এখানেই চোখের ইশারায় ঘরের বাকিদের বাইরে যেতে বললেন বিরূপাক্ষ — দিব্বেন্দু সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল।

"আপনি তবে একজন সিএ। রোজগার নিশ্চয়ই ভালোই। ভগবানের কৃপায়... মাফ করবেন, আপনাদের আরাধ্য দেবতার কৃপায় আয় মন্দ নয়।"

"মাফ করতে পারি, যদি আপনি আমাকে পাঁচশো এক টাকা ধার দেন। আমার ব্যাগটা ফেলে এসেছি।"

"কোনো সমস্যা নেই।" দিব্বেন্দু ওয়ালেট থেকে পাঁচটা একশো টাকার নোট বের করে দিল।

"বাহ, উপকার করলেন। বুঝলেন? আপনি এখনো ইনফ্যান্ট স্টেজে আছেন।" টাকাটা পকেটে পুরতে পুরতে বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী বললেন। "তাই ওসব 'ভগবান ভগবান' এখনো ছাড়তে পারেননি। শুনুন, আমাদের আরও দেখা হওয়া দরকার।"

"দরকার। আমিও তাই বলতে যাচ্ছিলাম। অসুবিধা না থাকলে এ সপ্তাহে যেকোনো রাত্রিরে আমরা একসঙ্গে ডিনার খেতে পারি।"

"বেশ বেশ। আজ হলো মঙ্গলবার — বৃহস্পতিবার হতে পারে।"

"ঠিক আছে। আমার বাড়িতে রাত আটটা।"

"বেশ বেশ, ঠিক আছে। আপনার ঠিকানাটা বলুন, নোট করে নিই।"

পরদিন সন্ধেয় বিষ্ণু শর্মার চেম্বারে এল দিব্বেন্দু।

"অমিতাভর কী অবস্থা হয়েছিল তা এখন আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি, গুরুদেব। ভদ্রলোকের যেমন প্রকান্ড চেহারা তেমন ব্যক্তিত্ব — কথাবার্তায় যেন জাদু আছে। যে কেউ মাত্র দু মিনিটও যদি তাঁর সঙ্গে কথা বলে, সে প্রভাবিত না হয়ে পারবে না। আপনি আমার পেছনে না থাকলে আমিও নিশ্চয়ই তাঁর একজন শিকার হয়ে পড়তাম। আমি ওর সম্বন্ধে আরও খোঁজখবর নিয়েছি — শয়তানের অনুচর বলেই ওকে আমার মনে হয়েছে।"

"যতই ক্ষমতা উনি অর্জন করে থাকুন না কেন, শয়তান কখনো দেবতার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। ভবিষ্যতেও পারবে না। পাপ চিরকাল পুণ্যকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। বৃহস্পতিবার তুমি এমন ভান করবে যাতে উনি মনে করেন যে তুমি ওর সহজ শিকার হয়ে পড়েছো। ওর বিশ্বাস অর্জন করতে পারলেই দুর্বলতার সূত্রগুলো প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তখন কাজ করতে সুবিধা হবে আমাদের।"

"সত্যি কথা বলতে কি, আমার যে ভয় করছে না — এ কথা বললে মিথ্যে হবে। আপনার দয়ায় এবং আমার মানসিক প্রস্তুতির জন্যই উনি আমাকে সম্মোহন করে মনের কথা এখনো জানতে পারেননি। কিন্তু কোনোমতে আমার মনের মধ্যে যদি উনি প্রবেশ করেন তবেই সর্বনাশ।"

"হ্যাঁ। সে কথা আমিও ভেবে দেখেছি। আমার এক্ষেত্রে যা যা করণীয় আমি তা করছি। তবু তুমি এটা সঙ্গে রেখে দাও।" একটা চৌকো কালো জিনিস তিনি দিব্বেন্দুর হাতে দিয়ে বললেন, "বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর সঙ্গে যখনই দেখা করবে, এটা যেন সঙ্গে থাকে।"

দিব্বেন্দুর ফ্ল্যাটে বৃহস্পতিবার রাত দশটায় বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী জাঁকিয়ে বসেছেন। একটু আগেই খাওয়া শেষ হয়েছে। মোগলাই খাওয়ার আয়োজন করেছিল দিব্বেন্দু। প্রচুর খেয়েছেন ভদ্রলোক, বেশ পরিতৃপ্ত। একটা মস্ত চুরুট ধরিয়েছেন — ঘর ধোঁয়ায় ভরে গেছে।

"শুনেছি আপনি জাদুবিদ্যায় পণ্ডিত।" একটু যেন ইতস্তত করে থামল দিব্বেন্দু।

"ও, আপনি প্রমাণ চান!" হেসে উঠলেন বিরূপাক্ষ। "আই অ্যাপ্রিশিয়েট! গুরুকে সবসময় বাজিয়ে নেওয়াই ভালো। এক কাজ করুন — আপনি পশ্চিম দিকের ওই জানলা দিয়ে বাইরে তাকান। আমি কথা বলা পর্যন্ত চুপ করে থাকবেন।"

আকাশে মেঘ জমেছিল, মাঝে মাঝে চাঁদকে ঢেকে ফেলছিল — চলছিল আলোআঁধারির খেলা। দমকা হাওয়ায় মনে হচ্ছিল এই বুঝি ঝড় উঠবে। রাস্তার আলো নিভে গেছে।

বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্ধকার মঞ্চের পর্দায় ভেসে ওঠা ছবির মতো একটা দৃশ্য ভেসে উঠল দিব্বেন্দুর মনের পর্দায়। যদিও একটু অস্পষ্ট। একটা পাহাড়, সারি সারি পাইন গাছ, অল্প বরফ পড়ছে। হঠাৎ কোথা থেকে কে একজন দৌড়ে এল — তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে ত্রাস। ছুটছে আর পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। তারপরেই যেন মাটি ফেড়ে আবির্ভাব হলো এক মূর্তির। আবছা এক মূর্তি — মাথায় দুটো শিং, সামনের দিকে ঝুঁকে দুহাত প্রসারিত করে সে তাড়া করেছে সেই মানুষটাকে।

দিব্বেন্দু চমকে উঠল। এ মূর্তি ওর অপরিচিত নয়। অমিতাভ — প্রাণভয়ে ছুটছে। কিন্তু মূর্তিটা দ্রুত দূরত্ব কমিয়ে আনছে। তারপরেই একসময় মূর্তিটা ধরে ফেলল সেই ধাবমান মানুষটাকে — রাহু যেমন চাঁদকে গ্রাস করে, তেমনি গ্রাস করে ফেলল বলে মনে হলো দিব্বেন্দুর। পরমুহূর্তেই মিলিয়ে গেল মূর্তিটা। আর সেই মানুষটাকে দেখা গেল মাটিতে পড়ে আছে — নিশ্চল, নিস্পন্দ।

"কেমন দেখলেন?" বিরূপাক্ষর কণ্ঠস্বরে আবার বাস্তব জগতে ফিরে এল দিব্বেন্দু। অতি কষ্টে আটকে রাখল রাগ আর চোখের জল।

"সাংঘাতিক! আমি যেন একটা আতঙ্কের ঘরে ছিলাম।"

"যার ওই নিষ্ঠুর পরিণতি আপনি দর্শন করলেন, সে একসময় আমার প্রতি দুর্ব্যবহার করেছিল। ভেবেছিল পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে পালিয়ে আমার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে।" হেসে উঠলেন বিরূপাক্ষ। "আমার ক্ষমতার হাত দুটো যে সুদূরপ্রসারিত, তা বেচারা ভাবতে পারেনি।"

"আপনার এ ক্ষমতার সামান্য যদি আমি অর্জন করতে পারতাম!"

বিরূপাক্ষ হাসলেন — ছোট ছেলের আবদারে বড় কেউ যেমন সস্নেহ হাসি হাসেন, অনেকটা তেমন। "আপনাকে আমাদের সঙ্গে গ্রহণ করব ভাবছি। আপনার মধ্যে পদার্থ আছে। যাক, এবার আমি উঠি — আমাকে আবার সংঘের আশ্রমে যেতে হবে।"

দিব্বেন্দু বুঝল, আশ্রম বলতে চেতলার সেই বাড়িটার কথাই বিরূপাক্ষ বললেন।

"আজ আমাদের বিশেষ একটা উপাসনা আছে। আচ্ছা ভালো কথা, কিছু টাকা দিতে পারেন?"

"হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।" দিব্বেন্দু পাঁচশো টাকার একটা নোট দিয়ে বলল, "আশা করি এতেই চলে যাবে।"

বিরূপাক্ষ বিদায় নেওয়ার পর দিব্বেন্দু বসবার ঘরে আর খাবার ঘরে — যে চেয়ারে তিনি বসেছিলেন সেই দুটোকে — জল দিয়ে ধুয়েমুছে নিজেও স্নান করল। এতক্ষণ নিজেকে ওর অশুচি মনে হচ্ছিল।

আচ্ছা, অমিতাভর মতো দিব্বেন্দুকেও কি ওই শয়তানটা গ্রাস করে নেবে?

"আর দেরি নয়, দিব্বেন্দু। খবর পেয়েছি উনি শিগগিরই নাগাল্যান্ডে যাচ্ছেন। সেখানে এক শ্রেণীর আদিবাসীরা বীভৎস এক মূর্তির পূজো করে — আদিম এবং অপ্রচলিত তন্ত্রমন্ত্রের চর্চা আছে তাদের সীমিত গণ্ডির মধ্যে। আরও আরও শক্তিধর হয়ে উঠতে চাইছেন বিরূপাক্ষ। তাই ওই মন্ত্রগুপ্তি লাভের আশায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। শয়তানের প্রতিমূর্তি ওই বিরূপাক্ষ। গত দু মাস আমার কীভাবে কেটেছে তা শুধু আমিই জানি।"

"আমি বুঝতে পারছি। তোমার কি মনে হয়? উনি তোমাকে এখনো বিশ্বাস করেন?"

"আমার সম্বন্ধে উনি কোনো ব্যক্তিগত ধারণা পোষণ করেন বলে আমার মনে হয় না। শুধু প্রয়োজনে আমি টাকা জোগাই। আপনি না থাকলে কবেই আমাকে ধরে ফেলত এই শয়তান।"

"তুমি চমৎকার কাজ করেছো। আমার নিশ্চিত ধারণা তুমি জয়ী হবেই। আমি এমনভাবে সময় ধরে কাজ করব যাতে রাত এগারোটা নাগাদ বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর বাড়ি পৌঁছাতে পারি। আমি তার আগে আপনাকে একটা ফোন করব।"

"হ্যাঁ, আমিও আমার যা করণীয় তা করব। আগামী মঙ্গলবারই দিন পাকা। তোমার যাত্রা শুভ হোক।"

একটা চিনা রেস্তোরাঁয় কয়েক পদ সুস্বাদু খাবার পরিতৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে একটা টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বিরূপাক্ষ বললেন, "এরা রান্নাটা করে ভালো। আপনাকেও আমার ভালো লেগেছে, মিস্টার সরকার। আমাদের ধর্ম এবং দর্শন সম্বন্ধে আপনি উৎসাহী, কিংবা প্রয়োজনে আপনি আমাকে টাকা ধার দিয়েছেন বলে ভালো লাগা নয় — অন্য একটা কারণে।"

"আপনার বোধহয় মনে আছে, আমাদের প্রথম সাক্ষাতে আমি একটু বিভ্রান্ত হয়েছিলাম — আপনি শত্রু না মিত্র তা বুঝতে পারিনি। এখনো সে ব্যাপারটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। আমার ধারণা আপনার মধ্যে কিছু ক্ষমতা আছে। আধিভৌতিক কোনো শক্তি আপনাকে ঘিরে রেখেছে — আপনি নিজেও তা জানেন না। একটা খুব শক্তিশালী প্রভাব আপনার হয়ে কাজ করছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই শক্তিটা বোধহয় আমার প্রতি মিত্রভাবাপন্ন নয়। তবুও আমি বলব, আপনার সঙ্গে এই দেখাসাক্ষাতে আমি আনন্দ পেয়েছি। আমি আশা করব এই দেখাসাক্ষাৎ ভবিষ্যতেও হবে।"

"এতক্ষণ ধরে আপনার মতো একজন জ্ঞানী পুরুষের সাহচর্য লাভ করা আমার পক্ষে পরম সৌভাগ্যের। আপনি যে রহস্যময় শক্তির কথা বলছেন, আমি সত্যিই সে ব্যাপারে কিছু জানি না। আর শত্রুতা — গত দু মাসে আমি নিশ্চয়ই আপনাকে বিশ্বাস করাতে পেরেছি যে আমি আপনার শত্রু নই, একজন গুণমুগ্ধ ভক্ত মাত্র।"

"তা পেরেছেন। নইলে আজ আপনি আর আমার সঙ্গে বসে গল্প করতেন না। সঙ্গী হিসেবে আপনি চমৎকার — সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। তবে আপনার মধ্যে একটা বিভ্রান্তিকর ভাব আছে। তা যা হোক, এবার ওঠা যাক।"

"আমি একটা কথা ভাবছিলাম।" দিব্বেন্দু যেন আবার একটু ইতস্তত করে বলল, "কাজের ব্যাপারে আমাকে আগামীকাল কিছুদিনের জন্য বাইরে যেতে হবে। আপনার সঙ্গে আবার কবে দেখা হবে ঠিক নেই। তাই ভাবছিলাম, আজ আপনার বাড়ি গিয়ে আপনার অলৌকিক ক্ষমতার কিছু নিদর্শন যদি... মানে আপনি একদিন বলেছিলেন—"

"হ্যাঁ, ভালো কথা, মনে করিয়ে দিয়েছেন। আজ আবার অমাবস্যা — যাবেন, চলুন তবে।"

"দারুণ। এক মিনিট, আমি বাড়িতে একটা ফোন করে আসি।"

ও উঠে বিষ্ণু শর্মাকে ফোন করল। দুজনের মধ্যে অল্প কথাবার্তা হলো। ফিরে এসে বিল মিটিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল।

বিরূপাক্ষ থাকেন কালীঘাট পার্কের পেছনে, টিপু সুলতানের বংশধরদের কবরখানার গা ঘেঁষে একটা বাড়ির একতলায়। অন্ধকার রাত্রে কেমন যেন একটা গা-ছমছম করা পরিবেশ। বিরূপাক্ষ জানালেন প্রায়ই নাকি রাস্তার আলো জ্বলে না।

ঠিক রাত এগারোটায় বিরূপাক্ষ ল্যাচ-কি দিয়ে সদর দরজা খুললেন। আর ঠিক সেই সময় বিষ্ণু শর্মা একটা অতি প্রাচীন পুঁথি খুলে একটা অদ্ভুত কাজে হাত দিলেন। একটা পাতলা ট্রেসিং পেপার ওই পুঁথির একটা ছবির উপর রেখেই তিনি সেটা এঁকে ফেললেন। তারপর বই দেখে কিছু মন্ত্র ওই কাগজে লিখলেন। বিষ্ণু শর্মা ছবিটা স্কেচ করলেন নীল কালিতে, ভেতরে দিলেন অন্য রং, আর মন্ত্রগুলো লিখলেন লাল কালিতে — রক্তের মতো লাল। ছবিটা দেখলে দিব্বেন্দু চমকে উঠত — এই ছবি তো অমিতাভকেও দিয়েছিল এই শয়তান।

ঘরের আবহাওয়া হঠাৎ কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠল। কাজ শেষ করে ওটা নিয়ে বিষ্ণু শর্মা কালীমূর্তির কাছে ধ্যানস্থ হয়ে বসলেন।

"কালী, কালী, মহাকালী, কালিকে পাপহারিণী..."

তাঁর শরীর ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল।

অন্যদিকে তখন বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী দিব্বেন্দুকে নিয়ে তাঁর ঘরে এসে বসেছেন।

"একটু কফি হবে নাকি? আমার আবার লোকজন নেই, সব কাজ নিজেই করি।"

"না না, আপনি একদম ব্যস্ত হবেন না। আপনার এখানে কফি খাব — তা আমি আগেই ভেবে নিয়েছিলাম। তাই এক কোটো কফি নিয়েই এসেছি। চিনিও এনেছি। শুধু দুধটা আনতে পারিনি। দুধ না থাকলে অবশ্য কোনো অসুবিধা নেই — ব্ল্যাক কফি হয়ে যাবে। আপনি শুধু কেটলিটা কোথায় আছে আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি হিটারে জল বসিয়ে দিচ্ছি।"

"আরে, আপনি যে আমার বাড়িতেও হোস্ট হয়ে যেতে চান দেখছি! ঠিক আছে, জল বসিয়ে দিন। পাশের ঘরে কেটলি, দুধ, চিনি সবই আছে।"

দিব্বেন্দু এটাই চাইছিল। ও পাশের ঘরে গিয়ে হিটারে জল বসিয়ে দিল।

"আজ রাত্রিরে আমার কোনো শত্রু বোধহয় আমার বিরুদ্ধে কাজ করছে। আমার তেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে।" ফিরে আসতেই বিরূপাক্ষ বললেন। "এসে যাক — আপনাকে কিছু ব্ল্যাক ম্যাজিক দেখাতে হবে তাই না? আপনি ওই জানলাটার সামনে চেয়ার টেনে বসুন। আমি না বলা পর্যন্ত পেছন ফিরে তাকাবেন না।"

নির্দেশমতো দিব্বেন্দু জানলার পাশে চেয়ার টেনে বসল। তারপর অন্ধকারে দৃষ্টি মেলে দিল। ওর চোখের সামনে যেন ঢেউয়ের পর্দার প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তারপরেই ওর চোখের সামনে ফুটে উঠল স্বল্পালোকিত একটি ঘর। অন্ধকারে আস্তে আস্তে দৃষ্টি সয়ে এল দিব্বেন্দুর। তারপরেই ওর নজরে পড়ল কয়েকটা মূর্তি নড়াচড়া করছে — প্রত্যেকেই সামনে ঝুঁকে পড়ে দুহাত বাড়িয়ে যেন কাউকে তাড়া করছে।

হঠাৎ ঘরের মাঝখান থেকে একটা আগুনের শিখা জ্বলে উঠল। তারপর এদিক-ওদিক আরও কয়েকটা অগ্নিশিখার কুণ্ডলী একটা নির্দিষ্ট মূর্তিকে ঘিরে জ্বলছে। মূর্তিটা আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দিব্বেন্দুর দিকে তাকাল — বিকট একটা মুখ, ভাটার মতো দুটো চোখ, মাথায় দুটো শিং। ক্রমেই বড় হয়ে যেন দিব্বেন্দুর দিকে এগিয়ে আসছে — যখন প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে, একটা আতঙ্কে দিব্বেন্দু দুহাত তুলে মুখটা ঢাকার চেষ্টা করল। আর তক্ষুনি সব মিলিয়ে গেল।

"কেমন বুঝলেন?" পরিহাস-তরল কণ্ঠে পেছন থেকে প্রশ্ন করলেন বিরূপাক্ষ।

"আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। কার মূর্তি ওটা?"

"আমাদের আরাধ্য দেবতার।" সসম্ভ্রমের কণ্ঠে উত্তর দিলেন বিরূপাক্ষ। "আপনার জল বোধহয় ফুটে গেছে। নিয়ে আসুন।"

দিব্বেন্দু উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ একটা তরঙ্গপ্রবাহ বয়ে গেল সারা শরীরে — মনে সাহস ফিরে এল। বিষ্ণু শর্মা তাঁর কাজ করছেন বুঝতে পেরে রোমাঞ্চ হলো ওর সর্বাঙ্গে।

পাশের ঘরে গিয়ে ও দুকাপ কফি বানাল। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট্ট বড়ি নিয়ে বিরূপাক্ষর জন্য নির্দিষ্ট কাপটায় চট করে ফেলে দিল। কয়েকটা বুদবুদ তুলে বড়িটা মিশে গেল কফির মধ্যে। কাপটা বিরূপাক্ষর সামনে রেখে নিজের কফিকাপে চুমুক দিল দিব্বেন্দু।

"আপনি যা দেখলেন, অনেকেই তাতে মূর্ছা যেত।"

"আমি তো আপনাকে বিশ্বাস করি, তাই অতটা ভয় পাইনি। এই কফিটা খুব কড়া হয়েছে — আসলে দুধ কম দিয়েছি তো। আচ্ছা, আপনি কি একটা কাগজের নকশার কথা শুনেছেন? আমার এক বন্ধু আসামে ছিল — সেখানে গারো পাহাড়ের কাছে এক শ্রেণীর পুরুত নাকি প্রেতচর্চায় খুব সিদ্ধ। ও বলছিল, তারা নাকি কাটা কাগজের নকশা রংচঙে করে শত্রুর কাছে পাঠায় — মন্ত্রপূত সেই নকশার মূর্তি নাকি জীবন্ত হয়ে শত্রু নিধন করে। আপনি শুনেছেন?"

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী বেদম বিষম খেলেন। কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, "আপনার বন্ধুর নাম কি?" তাঁর গলার স্বর ভারী হয়ে এসেছে।

"রামানুজ রায়। আপনি তাকে চিনবেন না।"

"হ্যাঁ, আমি ওই রীতির কথা শুনেছি। কাগজে এমন নকশা কাটা আমিও জানি।"

"সত্যি? কেমন করে ওটা করতে হয়? আমাকে একটু দেখাবেন।"

বিরূপাক্ষর চোখ দুটো ঘন ঘন নড়ে উঠল। তিনি মাথা দোলালেন। "ঠিক আছে। আপনাকে দেখাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা খুব বিপদজনক — আপনাকে খুব সাবধান হতে হবে। ওই যে সেক্রেটারিয়েট টেবিলটা আছে, ওটার শেষ ড্রয়ারে কয়েকটা পাতলা কাগজ আছে। একটা নিয়ে আসুন। টেবিলের উপরে একটা কাগজ কাটার কাঁচি আর দুটো রঙের পেন্সিল পাবেন — ওগুলো দরকার হবে।"

দিব্বেন্দু কথামতো সব নিয়ে এল। জড়ানো গলায় বিরূপাক্ষ বললেন, "যা বলছিলাম... এটা বিপদজনক। আসলে আপনার সামনে এ কাজ করা আমার উচিত নয়। আহ, কেন জানি না আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে, ঘুম পাচ্ছে..." তারপরেই যেন অসীম প্রচেষ্টায় সোজা হয়ে বসে তিনি কাঁচি দিয়ে কাগজের ধার ঘেঁষে কাটতে লাগলেন। দেখতে দেখতে সেটা একটা মূর্তির আকার নিল। এবার রং-পেন্সিল নিয়ে ওটাকে তিনি রংচঙে করে রূপ দিতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত নকশাটা যে বীভৎস আকার নিল, তার সঙ্গে দিব্বেন্দু অপরিচিত নয়।

"এই হলো সেই নকশা।" সন্তুষ্টচিত্তে বললেন বিরূপাক্ষ। "পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক কাগজের নকশা। মিস্টার সরকার, আপনি এটা পুড়িয়ে ফেলুন — এটা রাখা নিরাপদ নয়।"

দিব্বেন্দু পেছন ফিরে অন্য একটা কাগজ পুড়িয়ে ফেলল। আর ওটা পকেটে চালান করে দিল।

"আরেক পেয়ালা কফি দেব?"

"না না না, আপনি ভীষণ কড়া কফি বানিয়েছেন। আমার কেমন যেন লাগছে।" বিরূপাক্ষ সজোরে মাথা নাড়লেন। তাঁর মাথা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

দিব্বেন্দু ভদ্রলোককে মৃদু নাড়া দিল। "কী হলো? আপনি যে ঘুমিয়ে পড়ছেন! ওই কাগজের টুকরোটা বিপদজনক হয়ে উঠবে কীভাবে তা আমার জানতে ইচ্ছে করছে। শুনুন না।"

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ দুটো কষ্ট করে খুলে দিব্বেন্দুর দিকে তাকালেন। তারপর সামান্য বিকৃত কণ্ঠে বললেন, "আপনার ইচ্ছে করছে..."

"হ্যাঁ, বলুন আমাকে।"

"শুধু সাতটি কথা উচ্চারণ করতে হবে।" বিরূপাক্ষ ধূর্তের মতো বললেন, "কিন্তু আমি তা উচ্চারণ করব না। কিছুতেই না।"

হঠাৎ তাঁর দুচোখের দৃষ্টি প্রখর হয়ে উঠল। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, "ওটা কী? ও কোণায় ওটা কী?"

একটা অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি অনুভব করল দিব্বেন্দু। ঘরের ভেতরটা হঠাৎ যেন গুমোট হয়ে উঠেছে। আর হঠাৎ নিজের মধ্যে একটা শক্তির প্রকাশ পেল সে। দিব্বেন্দু চেনে এই শক্তিকে।

ও দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "মিস্টার চক্রবর্তী, আপনি আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু অমিতাভ দত্তকে খুন করেছিলেন। আর ওটা হলো তার প্রেতাত্মা।"

তারপরেই ও একলাফে বিরূপাক্ষর সামনে এসে দাঁড়াল। ভদ্রলোক চেয়ারে টলমল করছিলেন। বাঁ হাত দিয়ে তাঁকে শক্ত করে চেপে ধরে ডান হাতে কাগজের নকশাটা তাঁর কপালে ঠেকিয়ে ও বলল, "এবার বলুন, মিস্টার চক্রবর্তী। সেই কথাগুলো উচ্চারণ করুন।"

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখে একটা বিকৃত ভাব ফুটে উঠেছে। দুচোখ যেন ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে, চোখের মণি ধনুকের মতো দেখাচ্ছে। কষে গড়িয়ে পড়ছে ফেনা।

দুহাত উপরে তুলে যন্ত্রণাকাতর কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, "সেই আসে স্খলিত চরণে, চলে যায় নিঃসত্ত্বে..."

তারপরেই তিনি মাটিতে আছড়ে পড়লেন।

দিব্বেন্দু দ্রুত পদে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের আলো স্থিমিত হয়ে এসেছে, ভেতরে যেন আগুনের হালকা আভা। পরমুহূর্তেই দেওয়াল ফুঁড়ে একটা ছায়া আকার নিতে শুরু করল। ওটা দেখামাত্রই দিব্বেন্দুর মেরুদণ্ড বেয়ে নামল বরফগলা এক শিহরণ।

ছায়ামূর্তিটা ক্রমেই বড় হয়ে ঝুঁকে পড়ল ভূলুণ্ঠিত বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীর উপর। দরজা খুলে বেরোবার আগে ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকাল দিব্বেন্দু — বিকট সেই ছায়ামূর্তি যেন গ্রাস করে ফেলেছে বিরূপাক্ষ চক্রবর্তীকে। যেমন করেছিল অমিতাভকে।

একটা ঘোর আতঙ্কে দরজা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এল দিব্বেন্দু। অন্ধকার পথ ধরে ছুটল আলোর দিশা লক্ষ্য করে।

বিরূপাক্ষ চক্রবর্তী আর কোনোদিন নিরীহ মানুষের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু ওই মুহূর্তে দিব্বেন্দু চাইছে অন্ধকার থেকে আলোর রাজ্যে প্রবেশ করতে।

পিশাচসিদ্ধ বিদ্যা আয়ত্ত করে সর্বশক্তিমান হতে চেয়েছিল বিরূপাক্ষ। কিন্তু সেটাই তার কাল হলো। সেই মন্ত্রই বুমেরাং হয়ে ফিরে এসে ধ্বংস করল তাকে।

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url