যে ছেলে মরেও হিসাব চুকিয়ে গেল voy ar golpo

যে ছেলে মরেও হিসাব চুকিয়ে গেল voy ar golpo


কালিবাড়ির মাঠের পাশে ইটের ঢিপিটা যে কবে থেকে আছে সেটা বোধহয় এখন কারো মনে নেই। কার কাছে যেন শুনেছিলাম — অনেকদিন আগে মিউনিসিপালিটি থেকে মাঠের মধ্যে দিয়ে যাওয়া হাঁটাপথটাকে পাকা করার একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তারই প্রথম ধাপ ছিল ইট বিছানো। কিন্তু ইট আসার পর আর কোনো কাজ হওয়ার আগেই মাঠের জমিটির মালিক — মানে মিলিটারি — এই কাজ করতে বারণ করে দেয়। ফলে তখন থেকে শুধু ইটগুলোই পড়ে থাকতে থাকতে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে একটা ঢিপির আকার নিয়েছে।

স্টেশনে যেতে গেলে যেকোনো লোককেই এই ইটের স্তূপ পেরিয়ে যেতে হয়। গত শনিবার অনিরুদ্ধ যখন এই রাস্তা দিয়ে ট্রেন ধরতে যাচ্ছিল, তখন আমি ওকে দেখতে পেয়েছিলাম।

আমাদের এই কালিবাড়িতে মাসের দ্বিতীয় আর চতুর্থ শনিবার, বিশেষ করে সন্ধেবেলায়, বিশাল ভিড় হয়। নিয়ম করে এখানে যারা পুজো দিতেন তাদের মধ্যে একজন আমার ঠাকুরমাও ছিলেন। তখন এই নিয়ে ঠাকুরমাকে প্রচুর জ্বালিয়েছি। আসলে বেছে বেছে মাসের দুটো দিনেই ঠাকুরের বেশি জাগ্রত হওয়াটা আমার কাছে একটা বিরাট রসিকতার বিষয় ছিল।

এখন অবশ্য ওই দিনগুলোতে আমার মজা হয় না, বরং সাজা হয়। ভিড় বেশি মানেই বেশি জঞ্জাল, বেশি গোলমেলে কাজকারবার। এই দুটো দিন প্রচুর উটকো আর বাজে লোক এই ইটের স্তূপের চারপাশে ঘোরাঘুরি করে, থুতু ফেলে। অনেকে তো আরো খারাপ কাজকর্মও করে। তাদের ভাগিয়ে নিজের হাঁফ ছাড়ার জায়গাটুকু বের করতে করতে আমাকে নাকানিচোবানি খেতে হয়। গত শনিবারও ছিল তেমনি একটা দিন।

সন্ধে থেকে কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে লোকের ভিড়। তারই মধ্যে হঠাৎ করে আমার নজর পড়ল একটা ঘাড় গুঁজে হনহনিয়ে হাঁটা লোকের দিকে। অল্প বয়সেই মাথা জোড়া টাক। পরনে পাঞ্জাবি আর জিন্স। একটা ব্যাকপ্যাক এক কাঁধে নেওয়া। হাটে-মাঠে এমন লোক অজস্র দেখা যায়। কিন্তু দুটো বৈশিষ্ট্য লোকটাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।

প্রথমত, তার গায়ের রং অন্য পাঁচজন বাঙালির থেকে অনেক বেশি ফর্সা। দ্বিতীয়ত, হনহনিয়ে স্টেশনে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে ইটের স্তূপটার দিকে স্থির চোখে চেয়ে থাকা।

লোকটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই আমি চিনতে পেরেছিলাম। অনিরুদ্ধ।

সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় বহু বছর ধরে ঢিমে জ্বলতে থাকা একটা পুরনো আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল। মাথার মধ্যে ফ্ল্যাশব্যাক হয়ে পুরনো কথাগুলো পুরোপুরি ভেসে ওঠার আগেই আমার খেয়াল হল যে অনিরুদ্ধ ঘাড় গুঁজে হনহনিয়ে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। আমিও আর দেরি না করে ওর পিছু নিলাম।

অনিরুদ্ধর পক্ষে আমাকে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। তবুও কোনো ঝুঁকি নিইনি। যে সুযোগের জন্য এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছি, সেই সুযোগটা এবার যাতে কোনোক্রমেই হাত ছাড়া না হয়, সেজন্য আমি খুব সতর্কভাবে ওকে অনুসরণ করছিলাম।

অনিরুদ্ধ বোধহয় কিছু একটা আন্দাজ বা আশঙ্কা করেছিল। চারদিকে তাকিয়ে ও সেই সন্ধ্যার স্টেশন-ভরা ভিড়ের মধ্যেও যেভাবে কাউকে খুঁজছিল, সেটা কোনো ভেতু মানুষের আচরণেই দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত ও ট্রেনে উঠল। আমিও অন্য একটা কামরায় উঠে চেষ্টা করলাম ওর দিকে নজর রাখতে।

হঠাৎ করে মাঝের কোনো স্টেশনে ও নেমে গেল কিনা সেটা বোঝার জন্য আমাকে এই গ্যালপিং ট্রেনের দুটো স্টপেজেই ওঠানামা করতে হয়েছিল। তবে এই সময় শিয়ালদামুখী ট্রেনগুলোয় বেশি ভিড় হয় না। তাই আমি এই অতিরিক্ত ঝামেলাটা ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি।

অনিরুদ্ধ যেদিন আমাদের স্কুলে ভর্তি হল, সেদিন থেকেই ওর সঙ্গে আমার একটা ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছিল। এই লড়াইটা পরীক্ষার রেজাল্ট, টিচারের কাছে কে বেশি পছন্দের, জানালার ধারে কে বসবে বা স্কুলের সবচেয়ে বলশালী ছেলেটি কার বন্ধু — এইসব নিয়ে ছিল না।

লড়াইটা কী নিয়ে তা বলার আগে একটু নিজের কথা বলা দরকার।

খুব ছোট্টবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছিলাম। মানসিকভাবে ভীষণ শক্ত অথচ স্নেহময়ী ঠাকুমার কাছেই বড় হয়েছিলাম আমি। সারদা মিশনের প্রাক্তন শিক্ষক ঠাকুরমার স্নেহটা খুব বেশি পাওয়ার পরেও আমি আশপাশের পরিবারগুলোকে ঈর্ষার চোখে দেখতাম। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, পারিবারিক পিকনিক, এমনকি তাদের নিজস্ব আকচাআকচি — এসব দেখে আমার বুকের ভেতরটা বড্ড খালি খালি লাগত। নিজের ভেতরের এই খালিভাবটা ভরাট করার জন্য অনেকে অনেক কিছু করে।

আমি একটা খেলা খেলতাম। যাতে আমার অস্ত্র ছিল — ভয়।

যেসব ব্যাপারে অন্য অনেকে ভয় পায়, যেমন আরশোলা, মাকড়সা, সন্ধেবেলায় লোডশেডিং, নড়বড়ে মই ইত্যাদি — সেসবে আমার কোনো ভয় ছিল না। তাই আবর্জনার মধ্যে পাওয়া নানান রকম জিনিস থেকে আমি আমার খেলনা রবারের বা প্লাস্টিকের মাকড়সা, বিছে আর সাপ বানিয়ে নিতাম। তাদের দিয়ে এবং আরো নানাভাবে লোকের সঙ্গে নানান রকম প্র্যাকটিক্যাল জোকস করতে আমার দারুণ লাগত।

তবে এই খেলাটা আমি খেলতাম খুব সাবধানে। কেউ কখনো বুঝতে পারেনি যে এই জিনিসগুলো আমি করেছি। ফলে অন্য অনেক ব্যাপারে সম্পূর্ণ অকারণে নানান রকম অত্যাচার সহ্য করতে হলেও এই নিয়ে আমাকে কেউ কিছু বলতে বা করতে পারেনি।

এই মেঘনাদ রূপটা বজায় রাখার জন্য ঠাকুমার সঙ্গে আমি এই ধরনের কিছু করতাম না। কিন্তু প্রায় সবসময়ই আমার মাথায় ঘুরত — এরপর কাকে ভয় দেখানো যায়।

অনিরুদ্ধ যেদিন স্কুলে প্রথম এসেছিল, সেদিন অন্যরা কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই আমি ওকে স্বাগত জানাবার জন্য ওর চেয়ারে একটা ভীষণ রকম রিয়েলিস্টিক কাকড়াবিছে রেখে দিয়েছিলাম। ওর বসার জায়গাটা ছিল আমার সিটের থেকে কয়েকটা বেঞ্চ দূরে।

বসতে গিয়ে বিছে দেখে ওর মুখচোখের অবস্থাটা ঠিক কিরকম হতে পারে সেটা ভেবে এবং সেই মুহূর্তটা উপভোগ করবার জন্য আমি ওকে লক্ষ করছিলাম। অনিরুদ্ধ বসতে গিয়ে একটু থমকেছিল। কিন্তু তারপর ওর সিট থেকে না এসেছিল কোনো আওয়াজ, না এসেছিল কোনো লাফঝাঁপ।

তবে তাই বলে ব্যাপারটার যে কোনো প্রতিক্রিয়াই হয়নি, সেটা ভাবলে ভুল হবে। পরের ক্লাসে ইংরেজির স্যার রোল কলের জন্য রেজিস্টারটা রাখতে গিয়েই মুখ দিয়ে একটা বিচিত্র আওয়াজ করে নিজের চেয়ারটাকে পেছনে ঠেলতে গিয়ে আছড় খেয়েছিলেন।

ঠিক কী ঘটেছে তা বুঝতে আমার একটুও সময় লাগেনি। হুলুস্থুলের ফাঁকে টেবিল থেকে মেঝেতে পড়া বিছেটা সরিয়ে নিয়েছিলাম কোনোক্রমে। কিন্তু তার ফাঁকেই আমার নজর গেছিল অনিরুদ্ধর দিকে। ও খুব নিষ্প্রভ হয়ে সবকিছু দেখছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝেছিলাম — অনিরুদ্ধ বড় কঠিন প্রতিপক্ষ। কেউ ওর পেছনে লাগতে গেলে ও এমন কিছু করে যাতে ব্যাপারটা বুমেরাং হয়ে তার দিকেই ফিরে যায়। সেদিন বিছেটা ও স্যারের সামনে নিঃশব্দে রেখে দিয়েছিল এইজন্যই। ও জানত এই ধরনের কীর্তি সাধারণত যারা করে তাদের উপরেই এই বিশেষ ঘটনাটির দায় এবং অবধারিতভাবে তার জোড়া স্কেলের মার নেমে আসবে।

আমি বেঁচে গেছিলাম স্রেফ মেঘনাদ হয়ে থাকতাম বলে। কিন্তু ক্লাসের প্রধান বাহুবলী অমিত থেকে শুরু করে আমাদের নানাভাবে অপদস্থ করে আমোদ পাওয়া লাইব্রেরিয়ান নিপেনবাবু — সবার উপরেই এই প্রক্রিয়া অনিরুদ্ধ প্রয়োগ করেছিল।

ক্লাসের পড়ায় মন বসুক না বসুক, আমার রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হত। নাছোড়বান্দা স্বভাবের বসে পড়াটা রপ্ত না হওয়া অব্দি আমি লেগে থাকতাম। সেই একই কারণে প্রথম দিনের ওই অভিজ্ঞতার পরেও আমি হাল না ছেড়ে দিয়ে বরং বোঝার চেষ্টা করেছিলাম — ঠিক কী সে ভয় পায়, অনিরুদ্ধ।

আমাদের দুজনকেই স্কুলে নানানভাবে হেনস্থা হতে হত — অনিরুদ্ধ বাইরে থেকে এসেছে বলে, আর আমার মা-বাবা না থাকায়। ফলে নানাভাবে আমরা কাছাকাছি এসেই গেছিলাম। আমাদের মধ্যে এরপর যে সম্পর্কটা তৈরি হয়, সেটাকে বন্ধুত্ব না বলে সম্ভ্রম-মিশ্রিত সহমর্মিতা বলাই ভালো। কিন্তু আমি খেলাটা ছেড়ে উঠে যাওয়ার কথা কখনো ভাবিনি।

সেবার মাঠে আগাথা ক্রিস্টির মাউস ট্র্যাপ অবলম্বনে ইঁদুরকল নাটকটা মঞ্চস্থ হচ্ছিল। বড়দের নাটক হিসেবে বিজ্ঞাপিত হয়েছিল বলেই আমাদের মতো অপ্রাপ্তবয়স্করা ঝিয়েটিয়ে দেখতে গেছিল। নইলে রাত জেগে মশার কামড় খেয়ে কে দেখে ওসব। সেই রাতে পাশে বসা অনিরুদ্ধর মুখ থেকে হয়তো অসতর্কভাবে বেরিয়ে গেছিল একটা কথা।

"অন্ধকারকে আমরা এত ভয় পাই কেন কী জানো।"

সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথার ভেতরের কলকব্জাগুলো গড়তে শুরু করেছিল।

ট্রেনের দুলুনিতে কখন যে একটা ঝিমুনি ভাব এসে গেছিল সেটা টের পাইনি। হঠাৎ করে শিয়ালদা স্টেশনে ট্রেন ঢোকা এবং দুঃসাহসী সিট-অন্বেষীদের ঝাঁপিয়ে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা দেখতে পেলাম। বুঝলাম ভাবনা শেষ হয়ে কাজের সময় এসে গেছে।

ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে আমি একটু দূরে একটা স্টলের পাশে পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকলাম। অনিরুদ্ধ নামার পরেই আবার শুরু হল ওকে অনুসরণ করা।

ফ্লাইওভারের দিকের গেট থেকে বেরিয়ে এবারও অনিরুদ্ধ হনহনিয়ে হেঁটে চলল বউবাজার স্ট্রিট ধরে। রাস্তার কাদা, খালি ঝুপড়ি আর ঠেলারিকশার ভিড় পেরিয়ে। ওর হাঁটার ভঙ্গি বুঝিয়ে দিচ্ছিল এইদিকেই কোথাও থাকে। নইলে রাস্তার যা অবস্থা তাতে কোনো নতুন লোকের পক্ষে এত তাড়াতাড়ি হাঁটা অসম্ভব।

একটু পরেই ও ঢুকে পড়ল একটা টিমটিমে আলো আর ঝুঁকে পড়া শ্যাওলা-ধরা খয়েরি বাড়িতে ভরা গলিতে। এই গলিটা বোধহয় কর্পোরেশনের খাতায় নেই। তাই সারম্বরে লাগানো ত্রিফলা আলোর বদলে এখানে যে আলোগুলো ছিল, তাতে ল্যাম্পপোস্টের নিচে ছাড়া অন্য কোনো অংশই আলোকিত হয়নি। উল্টো দিক থেকে আসা সাইকেল, সার, মাতাল এবং আবর্জনার স্তূপ এড়িয়ে, আলোছায়ায় গা মিশিয়ে ওর পিছু নিয়েও আমি পুরনো কথাগুলোই ভাবছিলাম।

অনিরুদ্ধর বাবা রেলে চাকরি করতেন। স্টেশনের ওপর দিয়ে যাওয়া ওভারব্রিজটার নিচেই ছিল রেলের কোয়ার্টারগুলো। তাদের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা মার্কামারা সবুজ-লাল রঙের দুকামরার কোয়ার্টারে থাকত ওরা। তারপরেই ছিল কালিবাড়ির মাঠ।

সন্ধ্যার পর ওই চত্বরে আলো বলতে থাকত দূরের লাল-হলুদ-সবুজ সিগনাল আর বেশ কিছুটা দূরে হাইরোড দিয়ে যাওয়া ট্রাকের আলোর রেশ। এছাড়া ওই কোয়ার্টারগুলোর আর লেভেল ক্রসিংয়ের মাঝে আলোর উৎস বলতে ছিল মন্দির আর তার লাগোয়া কয়েকটা চায়ের দোকান।

ঠিক করেছিলাম ওই অন্ধকার জায়গাটাই হবে অনিরুদ্ধর সঙ্গে আমার খেলার ময়দান। তার সুযোগটা এসেও গেছিল একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই।

মাঠে খেলতে গেলে অকারণে অনেক গালাগাল আর মার খেতে হত। তাই আমি বিকেলটা কাটাতাম ব্রিজের এক মাথায় বই, স্টেশনারি আর অন্যান্য জিনিসের দোকানটায়। মাসে মাত্র দুটোর বেশি কমিক্স কেনার অনুমতি বা অর্থ আমার সঙ্গে থাকত না। দোকানের কাকুর নজর এড়িয়ে ঝুলতে থাকা কমিক্সগুলো যতটা সম্ভব পড়ে নেওয়াই ছিল আমার অন্যতম কাজ।

সেদিনও যথারীতি দোকানের একপাশে প্রায় অদৃশ্য হয়ে পাতা উল্টাচ্ছিলাম। তখনই এক মহিলা ওই দোকানে এলেন। অনিরুদ্ধর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায় তার প্রত্যেকটাই তার মধ্যে দেখা যাচ্ছিল — ভীষণ ফর্সা রং, খুব রোগা চেহারা, কেমন একটা অন্যরকমের ভুরু। মহিলাকে চিনতে আমার একেবারেই অসুবিধা হয়নি। অনিরুদ্ধর মা।

একে তো আমার স্বভাব কোনোকালেই মিশুকে ছিল না, তার উপরে তখন কথা বলতে গেলেই কাকুর নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তাই আমি চুপচাপ নিজের পড়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু ভদ্রমহিলার কথার মাঝে কয়েকটা টুকরোটাকরা শব্দ আর কাকুর মন্তব্য কানে আসছিল। শুনতে পেলাম পরের শনিবার আর রবিবার কোয়ার্টারে কাগজ দেওয়া হবে না, কিন্তু দুধ দেওয়া হবে।

অর্থাৎ ওই দুদিন অনিরুদ্ধ একা থাকবে।

সেই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম — অনিরুদ্ধকে ভয় দেখানোর এর থেকে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। শনিবার রাতেই একটা চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

ব্যাপারটাকে সহজ অথচ কার্যকরী করার জন্য আমি যে প্ল্যানটা ছকেছিলাম তার মূল সূত্রগুলো ছিল এইরকম।

এক — আমি আগেও দেখেছিলাম যে বাড়িতে রান্না না হলে অনিরুদ্ধ কালিবাড়ির পাশেই একটা ছোটখাট হোটেলে খেতে যেত। সেক্ষেত্রে ওকে খাওয়া সেরে রাতে ফিরতে হবে ওই ইটের ঢিপিটার পাশ দিয়েই।

দুই — শনিবার সন্ধেবেলায় স্কুলে স্পেশাল ক্লাস শেষ হতে হতে রাত সাড়ে আটটা বাজবেই। তারপরও সরাসরি ওই হোটেলে খেতে যাবে। সেখান থেকে বেরিয়ে ও যখন কালিবাড়ির মাঠে আসবে তখন অন্তত সোয়া নটা বাজবে।

তিন — আমাদের মফস্বল শহরে রাত নটা বাজলে লোডশেডিং হওয়ার ব্যাপারে প্রায় গ্যারান্টি দেওয়া যায়। ফলে দূরে স্টেশনের আলো আর মন্দিরের টিমটিমে কয়েকটা প্রদীপ ছাড়া ওই সময়ে পুরো মাঠ অন্ধকার।

চার — শনিবার রাত বলে নটার পর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামা বা ট্রেন ধরতে ছোটা যাত্রীদের ভিড় থাকবে না। দিনটা মাসের দ্বিতীয় বা চতুর্থ শনিবারও নয় যে প্রচুর ভক্তের উপস্থিতিতে আমার এই জমজমাট মঞ্চটা ঘেঁটে যাবে।

পাঁচ — স্পেশাল ক্লাসে যাওয়ার সময়ই আমার ব্যাগে একটা কালো কাপড় আর মুখে লাল রঙের পুরু সেলোফেন লাগানো দুটো পেন্সিল টর্চ থাকবে। ক্লাসের পর অনিরুদ্ধ যখন খেতে যাবে তখন আমি ইটের ঢিপিটার পেছনে চলে আসব। তারপর কাপড় জড়িয়ে বগলের তলায় একটা ভাঙা প্রতিমা থেকে জোগাড় করা দুটো বিশাল সাইজের নকল হাত ফিট করে, আর কপালের থেকে একটু উঁচু লেভেলে হাত তুলে টর্চ দুটো ধরে অপেক্ষা করব।

আমার এই পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার দুটো মাত্র জায়গা ছিল। ঢিপিটার কাছের ল্যাম্পপোস্টে ঢিল ছোড়ার নিশানা অভ্যাস করে তার একটাকে আমি শনিবার সকালেই ম্যানেজ করে নিয়েছিলাম। এতে হঠাৎ করে লাইট চলে এলেও আমি ধরা পড়তাম না। বরং দূরের আলোগুলোর সুবাদে তৈরি হওয়া লম্বা ছায়া আমার অনুকূলে যেত। দ্বিতীয় ব্যাপারটা হত যদি হঠাৎ করে স্টেশনের বা মন্দিরের দিক থেকে অনেক লোক অনিরুদ্ধর সঙ্গেই মাঠে চলে আসত। ওই নিয়ে আমার কিছু করার ছিল না।

অনিরুদ্ধ হঠাৎ করে থেমে গেল।

মোবাইল কানে চেপে গজগজ করতে থাকা একটা লোক আরেকটু হলেই ওর উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। আমার ক্ষেত্রে সে আশঙ্কা ছিল না। তবুও আমিও একটু অবাক হলাম ওর হঠাৎ থেমে যাওয়ায়। তারপর বুঝলাম ও একটা গলির মুখে থেমেছে। একেবারে হেজে যাওয়া একটা বাড়ির দরজার পাশ দিয়ে ঢুকে গেছিল নোংরা আর শেওলায়-সবুজ গলিটা।

আমি অনিরুদ্ধর পিছু পিছু গলিতে ঢুকলাম না। আমি জানান দেওয়ার আগে ও আমার উপস্থিতি টের পাক — এটা আমি চাইছিলাম না। ও কিছুটা এগিয়ে গেল। একটা বেঁকে যাওয়া মোটা জলের পাইপের আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম — টিমটিমে আলো জ্বালা একটা মলিন দরজার পাশের কলিংবেলটা টিপল অনিরুদ্ধ।

দরজা খুলে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। তৎক্ষণাৎ আমার গলার কাছটা ব্যথায় দবদব করতে শুরু করল। এই ব্যথাটা আমি চিনি — এটা তখনই হয় যখন আমি বুঝতে পারি যে কেউ খুব বিপদে পড়েছে।

আমার আশঙ্কাটা একেবারে পাকা হয়ে গেল তারপরেই। দরজা দিয়ে বাইরে উপচে আসা জোড়ালো আলোয় অনিরুদ্ধর মুখচোখ বলে দিচ্ছিল ও ভয় পেয়েছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দাড়িওয়ালা মুষ্টিমেয় লোক মুখ বাড়িয়ে গলিটার দুটো দিক প্রথমে দেখল। তারপর খুব অভদ্রভাবে পাঞ্জাবির সামনেটা ধরে এক হ্যাঁচকা টানে অনিরুদ্ধকে টেনে নিল বাড়ির ভেতরে। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল তারপরেই।

আমি পাইপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বন্ধ দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম। বেশ বুঝতে পারছিলাম — আমার খেলার মাঝখানে অন্য কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। গলার কাছের ব্যথাটাও বেড়ে চলেছিল পাল্লা দিয়ে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ ওখানেই দাঁড়িয়ে ভাবলাম আমার আর এগোনোটা উচিত হবে কিনা। শেষ পর্যন্ত আর কিছু না হলেও ব্যথার দবদবানির ঠেলায় ঠিক করলাম — বন্ধ দরজার ওপাশে কী হচ্ছে আমায় জানতেই হবে।

তবে অনিরুদ্ধ বা তার বাড়িতে স্পষ্টতই অনাহূত লোকটিকে সেটা বুঝতে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। খুব ঝটপট বাড়িটাকে একচক্কর দিয়েই আমি বুঝতে পারলাম যে এই বহু পুরনো বাড়িতে বেশ কিছু পরিবারের বাস। সেখানে আস্ত বা ভাঙা দরজা আর জানালা প্রচুর হওয়ার ফলে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আমি অন্য একটা দিক দিয়ে বাড়িটায় ঢুকে পড়লাম।

তারপর বাড়ির যে দিকটায় অনিরুদ্ধ থাকে সেটা খুঁজে বের করলাম। একটা ভাঙা জানালা দিয়ে একেবারে ওর ডেরায় ঢুকে পড়তে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না। বাসনকোসন, আলমারি, বই, দেওয়াল-ঘেঁষা ছোট্ট ঠাকুরঘর আর তাক-বোঝাই নানা জিনিসে ভরা একটা ঘরে আমি দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

তার পাশের ঘরটায় — যেখানে দরজা দিয়েই ওই লোক অনিরুদ্ধকে টেনে ঢুকিয়েছিল — তখন একটা রোমহর্ষক নাটক অভিনীত হচ্ছিল। অন্য সময় হলে আমি নাটকটা উপভোগ করতাম, কিন্তু গলার ব্যথা আর অনিরুদ্ধর সঙ্গে হিসাব বরাবর করার ইচ্ছেটা আমার মেজাজ খারাপ করে দিয়েছিল। তাই আমি শুধু কথোপকথন শোনা এবং ঘরের বাসিন্দাদের পর্যবেক্ষণ করায় নিবিষ্ট হলাম।

ঘরের একমাত্র ভদ্রসভ্য চেয়ারটায় বেশ আরাম করে বসেছিল পাজামা-পাঞ্জাবি পরা লোকটা। চিবিয়ে চিবিয়ে, থেমে থেমে বলল, "আপনি কিন্তু আমাদের বেশ খেলা..."

লোকটার পোশাক, হাতের ঘড়ি, আঙুলের আংটি, কথা বলার ভঙ্গি — এসবে বেশ পালিশ ছিল। দাড়িওয়ালা লোকটা দাঁতের ফাঁক দিয়ে একটা বিশ্রি গালাগাল দিল। তবুও অনিরুদ্ধ সপাটে বলল, "আমি ছোট কোম্পানির খেলনা বেচি, মিস্টর দত্ত। মানুষের জীবন নিয়ে খেলাটা কিন্তু আপনাদের থেকেই শিখেছি।"

মিস্টর দত্ত নামক এই লোকটা কথার পাল্টা কী বলে তা খেয়াল করার বদলে আমার নজর পড়ল ঘরের অন্য দুই বাসিন্দার দিকে। এতক্ষণ তারা এতই চুপচাপ ছিল যে মনে হচ্ছিল ওরাও ঘরের আসবাবমাত্র।

একজন মহিলার পরনে ঘরোয়া রাতপোশাক, মাথায় সিঁদুর, আর মুখে জমাট বেঁধে থাকা ভয় — সহজেই তাকে চিনিয়ে দিচ্ছিল অনিরুদ্ধর স্ত্রী হিসেবে।

ঘরের অন্য বাসিন্দাটির দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠল। একটা নিচু চেয়ারে বসেছিল মেয়েটা। তার বয়স খুব বেশি হলে দশ হবে। কিন্তু তার বসে থাকার ভঙ্গি আর পাশেই রাখা হুইলচেয়ারটা বুঝিয়ে দিচ্ছিল — খোলা আকাশের নিচে দৌড়ে বেড়ানো আর নিজের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার যে স্বাধীনতাটুকু আমার ছিল, সেটাও এই মেয়েটার নেই। তবে মেয়েটার বিবর্ণ মুখ বলছিল — বয়স কম হলেও মা আর বাবার মুখ দেখে ও বুঝে গেছে ভীষণ বিপদের মধ্যে আছে ওরা।

তক্ষণই আমার কাছে স্পষ্ট হল আমার গলার ব্যথাটা কার বিপদের কথা ভেবে হচ্ছে।

"কথার খেলাপ আমি করিনি, মিস্টর দত্ত।" অনিরুদ্ধর কাটা কাটা গলাটা শুনে আমার আবার সম্বিৎ ফিরল। ও শান্ত ভঙ্গিতে স্পষ্ট উচ্চারণে বলছিল, "একটা স্পেশাল কনসাইনমেন্ট খিদিরপুরের গোডাউন থেকে নিয়ে আপনার দোকানে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। তাতে করে খেলনার নামে যে ড্রাগ যাচ্ছে সেটা আমি টের পেয়েছিলাম — ওখানে কিছু জিনিস দেখে আর কথা শুনে। বোনাসের লোভ দেখিয়ে আমাকে দিয়ে কোম্পানির গাড়িতে করে ও জিনিস ঢালা ও বিলি করাতে চাইছিলেন। বোনাসের টাকাটা আমার মেয়ের জন্য কাজে লাগত। কিন্তু তাই বলে ড্রাগস?"

অনিরুদ্ধর গলার আওয়াজে এমন কিছু ছিল যে লোকটা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। অনিরুদ্ধকে একটা ধাক্কা মেরে সে ঘরের কোণে ঠেলে দিল। ওর বউ সেদিকে ছুটতে যাচ্ছিল, কিন্তু দত্ত খপ করে বাচ্চা মেয়েটার একটা হাত ধরে মুচড়ে দিল।

মেয়েটা ব্যথায় কোঁকিয়ে উঠল। ঘরের সবাই একদম স্থির হয়ে গেল। যেন কিছুই হয়নি — এইরকম একটা ভঙ্গিতে দত্ত বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াল।

মেয়েটার ঘাড়ের কাছে নিজের তর্জনীটা একটা বিষাক্ত সাপের মতো আলতো আলতো করে ঘষতে ঘষতে লোকটা বলে উঠল, "তাই আপনি কাউকে কিছু না জানিয়ে ড্রাইভারকে শুধু তাড়া দিলেন। তাড়া দিলেন। তার ঠেলায় সে ওই কুইন্সরোর মোড়টায় ট্র্যাফিক আইন ভাঙল — যেখানে সবচেয়ে বেশি পুলিশ পোস্টিং থাকে। তাই না? সার্জেন্ট আপনাদের দাঁড় করাল। আপনি তাকে আমাদের ওই ওয়ার্ক অর্ডার দেখালেন, যাতে বলা ছিল যে সকাল দশটার মধ্যে জিনিস পৌঁছে দিতেই হবে। কে? তা স্বাভাবিকভাবেই সার্জেন্ট কন্টেন্ট চেক করল। তখন আপনি কোনোভাবে তাকে আভাস দিলেন যাতে খেলনাগুলো খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়। সাব্বাস।"

শেষের কথাটা খুব তারিফ করার ভঙ্গিতে বললেও লোকটার মুখ দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম — রাগে সে থরথর করে প্রায় কাঁপছে। হয়তো সেজন্যই লোকটার পরের কথাগুলো একেবারে হিসহিসিয়ে বেরলো।

"এত বুদ্ধি আপনার। তাও শেষে খেলনা বেচে দিন কাটাতে হয় আপনাকে।"

অনিরুদ্ধর মুখে এতক্ষণে ওর আর ওর মেয়ে-বউয়ের এই বিপদের মধ্যেও একটা তীব্র ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ছাপ পড়তে দেখলাম। আমার চোখের সামনে আবার ভেসে উঠল সেই শনিবারের রাতটা।

সেই রাতে পুরো ব্যাপারটা প্ল্যানমাফিক এগচ্ছিল। কোচিংয়ের পর সোজা ক্যাম্প করেছিলাম কালিবাড়ির মাঠে ঢিবিটার পেছনে। একটা দারুণ উত্তেজনা হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। জানতাম অনিরুদ্ধকে ভয় দেখানোটা সহজ হবে না। তাই ও খাওয়া সেরে ফেরার আগে আমি মাথার মধ্যে সম্ভাব্য ঘটনাক্রমটা বারবার ছকে নিচ্ছিলাম।

শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছিলাম ওর সামনে না এসে বরং পেছন থেকে আসাটাই নিরাপদ হবে। তাহলে পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে নিছক কৌতূহলী হয়ে ও তাকাবে। কালিবাড়ির একপাশে ছোট্ট ঘরটা — যেখানে শিবলিঙ্গ থাকে, যেটা নিয়ে প্রচুর গল্পগুজব চালু আছে — সেখান থেকেই একটা লাল চোখ লম্বা মূর্তিকে বেরিয়ে আসতে দেখবে। এফেক্টটা তাহলে জোরদার হতে বাধ্য।

মন্দিরের পাশে ঝিমানো নেড়ি কুকুরগুলো এই পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে পারত। কালিবাড়ির পেছন দিয়ে আমার সন্তর্পণে শিব মন্দিরটার দিকে এগোনো আর লুকোনোর চেষ্টা দেখে তারা চেঁচালেই সব মাটি হত। তবে সেই রাতে ওসব কিছুই হয়নি।

অনিরুদ্ধকে কালিবাড়ির কাছাকাছি আসতে দেখেই এক দৌড়ে শিব মন্দিরের পেছনে পৌঁছে গেছিলাম। কিছুক্ষণ কাটল। কালিবাড়ি আর ওদের কোয়ার্টারের মধ্যে তিনটে ল্যাম্পপোস্টের মধ্যে প্রথমটা পেরলো অনিরুদ্ধ। তখন আমি মন্দিরের পেছন থেকে বেরিয়ে ওর পিছু নিলাম।

পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে অনিরুদ্ধ প্রথমে ঘাড়ের উপর দিয়ে পেছনে তাকাল। তারপরও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমায় দেখল।

নিজের মুখে বললে গর্ব বলে মনে হতে পারে। তবে খুব সামান্য জিনিস দিয়েও ভয় দেখানোর মতো স্পেশাল এফেক্ট বানানো সহজ নয়। আমি সেই বয়সেই সিদ্ধিলাভ করেছিলাম। তাই হঠাৎ করে অন্ধকার নির্জন মাঠে আমাকে ওই রূপে দেখে অনিরুদ্ধ যে ভয় পাবে, এ ব্যাপারে আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম।

কিন্তু এরপর যেটা হল — তার জন্য আমি একেবারেই তৈরি ছিলাম না।

ছুটে পালানোর চেষ্টা না করে বরং মুখ দিয়ে একটা গোঙানোর আওয়াজ করে ওখানেই পড়ে গেল অনিরুদ্ধ।

আত্মপ্রসাদে আর আনন্দে একটু ফুলে উঠেছিলাম আমি। তার পাশাপাশি অনিরুদ্ধকে নিয়ে একটু চিন্তাও হচ্ছিল। তাই খেলা শেষ বলে আমি ওর কাছে গিয়ে ওর গলার কাছে হাত দিয়েছিলাম।

পরক্ষণেই আমি চমকে উঠেছিলাম। কারণ অনিরুদ্ধর শরীরটা বরফের মতো ঠান্ডা বলে মনে হয়েছিল। পাঠ্য বইয়ের নিয়ম মেনে আমি প্রথমে ওর পালস খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওর রেডিয়াল ধমনীতে প্রাণের কোনো স্পন্দন আমি খুঁজে পাইনি।

অনিরুদ্ধ মৃত।

এমন কিছু হতে পারে আমার ধারণাতেও ছিল না। ভয়ে কিছুক্ষণ জড়বুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর আমি শেষ পর্যন্ত ডাক্তার ডাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। জানতাম যে অনিরুদ্ধর যাই হোক না কেন, আমার কপালে অশেষ লাঞ্ছনা আছে। কিন্তু তবুও নিজের খেলার এই পরিণতি আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। অত রাতে ডাক্তার বলতে একমাত্র সম্বল হতে পারত রেলের কোয়ার্টারগুলোর এক প্রান্তের ওষুধের দোকানের ফার্মাসিস্ট। আমি সেই দিকেই ছুটতে শুরু করি।

কিন্তু ইটের স্তূপটার কাছে পৌঁছে গেছি যখন, তখন পেছন থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম।

"দপন।"

কলকাতার এই গলির বাড়িতে, তাও আবার দত্ত নামের ওই ভদ্র চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকা জঘন্য লোকটার মুখে হঠাৎ আমার নিজের সন্দীপন নামের এই সংক্ষিপ্ত সংস্করণটা উচ্চারিত হতে শুনলাম।

"আপনি আর আপনার কয়েকজন বন্ধু এই নামের সংস্থাটা চালান — ছেলেমেয়েদের খেলনা দেওয়ার জন্যে। সেটা আমরা জানি।"

বাচ্চা মেয়েটার ঘাড়ের কাছে সেই গাঘেঁয়ামি ওঠার মতো আঙুল বোলাতে বোলাতে লোকটা বলে চলল, "আজ আমার লইয়ার বেলটা করিয়েই দিলেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আপনি সেই সংস্থার কাজেই কোথাও গেছেন। তখনই ঠিক করে ফেললাম — আপনার ফ্যামিলিকে মানে বিশেষ করে আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেব। সারপ্রাইজ। তাহলে এবার আমার খেলাটা শুরু করা যাক।"

দত্তর মুখে এই শেষ কথাটা শোনামাত্র ওর সঙ্গের লোকটার চোখে আমি একটা ভয়াবহ ইঙ্গিত দেখলাম। আমার খুব অস্থির লাগতে শুরু করল। গলার ব্যথাটা ততক্ষণে গলা ছাপিয়ে আমার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে।

সেই মুহূর্তে চোখ পড়ল বাচ্চা মেয়েটার দিকে। আমার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। মেয়েটা এক দৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়েছিল। কতটা অবাক হলাম সেটা ঠিক বুঝিয়ে উঠতে পারব না। তার মধ্যেই মেয়েটা মৃদু সুরে আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল,

"তোমার গলায় কি খুব ব্যথা?"

মনে হল ঘরের মধ্যে সবাই আর সবকিছু যেন থেমে গেছে। অনিরুদ্ধর দিকে একঝলক তাকিয়ে নিশ্চিত করতে চাইলাম ও আমাকে দেখতে পাচ্ছে কিনা। আসলে সেই রাতের পর ওকে আমি বিশ্বাস করতে পারি না।

আমার নাম ধরে ডাকটা শুনে আমি ছুটন্ত অবস্থাতেই পেছন ফিরে তাকিয়েছিলাম সেই রাতে। অন্ধকারের মধ্যেও দেখেছিলাম — অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়িয়েছে। অবাক হয়ে থামতে গিয়ে আমি একটা আদলায় হোঁচট খেয়েছিলাম। তাতেই আমি ঠিকরে পড়ি ইটের স্তূপটার উপর। আমার পুরো শরীরের ভার নিয়ে গলাটা আছড়ে পড়ে একটা ইটের ধারে। তারপর সব অন্ধকার।

সময়ের হিসাব দিতে পারব না। তবে ওই হোঁচট খাওয়া, ইটের কোণে লেগে আমার গলাটা কার্যত চেপটে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে — আমি বর্তমান থেকে অতীত হয়ে যাই।

অনিরুদ্ধ যদি সময়মতো সেই ফার্মাসিস্টকে পেত তাহলে হয়তো এই গল্পটাই হয়ে উঠত না। কিন্তু সেটা আর হয়নি।

নিজের দুমড়ে যাওয়া শরীরটার পাশে দাঁড়িয়ে অনেক লোকের ভিড়ে ফোঁপাতে থাকা অনিরুদ্ধর কথা শুনেছিলাম। ও বলেছিল — আমি যে বইয়ের দোকানের এক কোণে দাঁড়িয়ে ওর মা আর দোকানের কাকুর কথা শুনছিলাম, সেটাও দেখেছিল দূর থেকে। তারপরেই নাকি ও তৈরি হতে শুরু করেছিল এই রাতের জন্য।

ইঁদুরকল দেখতে গিয়ে ওর ওই মন্তব্যটাও কি আমার জন্যই টোপ ছিল? হয়তো।

রীতিমতো প্র্যাকটিস করে অভ্যস্ত হওয়ার পর ওর মায়ের প্রসাধনী বাক্স থেকে নেওয়া স্পিরিটের সাহায্যে ও গলার কাছ আর অন্য অনাবৃত অংশগুলো ঠান্ডা করে নিয়েছিল মাঠের মাঝে চলতে চলতেই। বগলের তলায় টাইট করে বাঁধা একটা কাপড়ের বল গুঁজে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল রেডিয়াল ধমনীকে স্পর্শ করে পালস বোঝার পথ।

ওর কথাগুলো শুনে রাগ হওয়ার বদলে ওর প্রতি একটা সম্ভ্রমের অনুভূতিই গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ঠাকুমাকে দেখে মনোভাবটা বদলে গিয়েছিল।

ঠাকুরমা আমাকে বারবার ঝাঁকিয়ে বলছিল, "দিপু... ও দিপু... এবারও আমি জানি তুই আমায় ভয় দেখানোর জন্য এভাবে শুয়ে আছিস।"

শেষের দিকে রোজকার মতো হাসি আর রাগের বদলে কেমন একটা শূন্যতায় ভরে যাচ্ছিল ঠাকুমার গলাটা। তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম — আমি এর বদলা নেবই।

"মেয়েটা পাগল নাকি স্যার?" মুষ্টিমেয়ের ফ্যাসফ্যাসে গলাটা শুনে আমি আবার বর্তমানে ফিরে এলাম। ওই দরজায় তো কেউ নেই। তাহলে মেয়েটা কার সঙ্গে কথা বলছে?

"বসের ঘরটা থাক। আমি এদিকটা দেখছি।" লোকটার হাতে একটা ছোট্ট প্রায় খেলনার মতো পিস্তল উঠে এল। ইতিমধ্যে সে আমার গা ঘেঁষেই ঘরটায় ঢুকল।

আমি তখনই বুঝতে পারলাম — আজকের খেলাটা নিজের অনুকূলে নিয়ে আসার এর থেকে ভালো সুযোগ আর আসবে না।

তখন যদি আজকের মতো করে এইসব জিনিস পারতাম তবে গল্পটা এই জায়গায় এসে পৌঁছাত না। অনিরুদ্ধর নোট গাছটি সেই রাতেই মুড়িয়ে যেত।

হঠাৎ করে মারা গেলে সবারই কি এমন হয়, জানি না। তবে আমি ওই ইটের স্তূপ আর কালিবাড়ির মাঝেই রয়ে গিয়েছিলাম। অন্য কোথাও যেতে যতবার চেষ্টা করেছি, মোটেই ভালো লাগেনি। ঠাকুরমার মুখে শোনা অন্য সব জায়গা — মানে ওই স্বর্গ-নরক ইত্যাদি — আদৌ আছে কিনা তাও জানতে পারিনি। ওপর দিকে কখনো উঠতে পারিনি আমি। শুধু আমার জায়গায় যাতে অন্য কেউ আস্তানা গাড়তে না পারে সেটা নিশ্চিত করবার চেষ্টা করেছি।

একমাত্র হাতিয়ারটি ব্যবহার করতে করতে হাত পাকা হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে বছর কুড়ির অভ্যাস — তাও আবার ওই ইটের ঢিপির ভারি ভারি ইট তুলে ফেলার — দেওয়ালের তাকে রাখা কেজি পাঁচেকের টিনটা তুলে সেই লোকটার ঠিক ব্রহ্মতালু বরাবর নামিয়ে আনতে আমার কোনো অসুবিধাই হল না।

তারপরেই আমি এই কুড়ি বছরে একেবারে দুরস্ত করে ফেলা দ্বিতীয় বিদ্যাটি কাজে লাগালাম। সেই লোকটার অজ্ঞান শরীরটাকে কব্জা করে বাইরের ঘরে এলাম।

দত্ত সেই লোকটার শরীরটাকে ঘর থেকে বেরোতে দেখে প্রথমে আশ্বস্ত হয়ে পিস্তলটা অনিরুদ্ধর দিক থেকে নামিয়েছিল। কিন্তু সেই লোকটার চোখের দিকে তাকাতেই ও বুঝে গিয়েছিল সামনে বিপদ। হাতটা আবার তোলার আগেই আমি অবশ্য কাজ সেরেছিলাম। সেই লোকটার পকেটে থাকা একটা লোহার ছোট কিন্তু শিষে দিয়ে ভারি করা হাতুড়ি ততক্ষণে আমি পেয়ে গেছি। লোকটার কপাল লক্ষ্য করে সেটা ছুড়তে আমার যতটুকু সময় লেগেছিল, এই বাক্যটা পড়তে গিয়ে আপনাদের ব্যয় করা সময়ের চেয়েও কম।

এটাও খেয়াল রাখতে হয়েছিল — অনিরুদ্ধ আর তার পরিবার যেন অনর্থক পুলিশি ঝামেলায় না জড়িয়ে পড়ে। তাই টিন আর হাতুড়ি দুটোই বেশ মোলায়েম করে ব্যবহার করেছিলাম।

সংস্থার নাম শুনেই বুঝেছিলাম অনিরুদ্ধ ওর মতো করে আমাদের হিসেবটা বরাবর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আমি বিশেষভাবে কৌতূহলী ছিলাম ওর মেয়েকে নিয়ে।

সেই লোকটার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম এটা দেখার জন্যই যে মেয়েটা এখনো আমায় দেখতে পায় কিনা। ততক্ষণে অনিরুদ্ধর বউ আর অনিরুদ্ধ মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করেছে।

তারই মধ্যে মেয়েটা আবার আমার চোখে চোখ রেখে বলল, "তোমার গলায় কি খুব ব্যথা?"

অনিরুদ্ধ ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো ঘুরে আমার দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টি বুঝিয়ে দিল — ও আমায় দেখতে পাচ্ছে। জড়ানো গলায় কিছু বলেছিল। ক্ষমা... কৃতজ্ঞ... ফিরে এসেছিস... এমন কয়েকটা শব্দ বোধগম্য হল।

তবে আমার সেদিকে খেয়াল ছিল না। ততক্ষণে গলায় ব্যথা উধাও হয়ে গেছিল। আরো একটা জিনিস আমি অনুভব করলেও বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু অনিরুদ্ধ, ওর বউ আর ওর মেয়ের চোখের নড়াচড়া দেখে সেটা মানতেই হল।

আমি ওপরে উঠতে শুরু করেছিলাম।

আমি এখনো উপরে উঠছি। মেঘ ছাড়িয়ে, পায়ের নিচে নীল বলের মতো পৃথিবীকে ফেলে, এখন আমি মহাকাশের একটা বিশেষ দিকে যাচ্ছি। সেখানে অজস্র তারার নানান রঙের আলো ছড়িয়ে আছে। সঙ্গে আছে কেমন একটা হালকা সুরের মতো গুনগুন।

সুখটা চেনা লাগছে। সন্ধেবেলা ধুনোর ধোঁয়া বুকে ভরে কার গলায় যেন এই সুখটা শুনতাম।

ঠাকুমা... ঠাকুমা আমি আসছি তোমার কাছে। এবার আবার আমায় দেখে ভয় পাবে না তো?

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url