ইটভাটার অন্ধকার সেই রাতে bangla horror story


ঘটনাটা তানভীরের সাথে ঘটে ২০১০ সালে। তানভীরের বাড়ি ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে। আর তানভীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। এখানকার ছাত্রাবাসে থাকতেন। বিভিন্ন সময় তিনি ছুটিতে বাড়ি যেতেন। সেবার ঈদের ছুটিতে তিনি বাড়ি গেলেন।

ঈদের ছুটি মানেই লম্বা ছুটি। আর ঈদের ছুটি মানেই বেশ আনন্দের সময়। কারণ বাড়িতে গেলে সবাই থাকে — পরিচিত আত্মীয়স্বজন। তো বেশ মজা করছিলেন তানভীর। নিজেদের বাড়িতে বেশ সময় কাটালেন। এরপরে গেলেন তাঁর নানাবাড়িতে। নানাবাড়ি বেশ কাছাকাছি কোনো একটা জায়গায়। সেখানে গিয়ে কাজিনদের সাথে আরও মজা করছেন। সেখানকার কাজিনদের বন্ধুবান্ধবের সাথেও তাঁর মোটামুটি পরিচয় ছিল। তারাও তাঁর সাথে বেশ আনন্দফুর্তি করছেন।

তাঁর নানাবাড়িটা ছিল নদীর একদম কোল ঘেঁষে। সেখান থেকে তারা হেঁটে হেঁটে ঘাটে যেতেন, নদী পার হতেন, আর ওপারের বাজারে আড্ডা জমাতেন। ঈদের পরের সময়টা বেশ জমজমাট — অনেকেই ঢাকা বা বিভিন্ন শহর থেকে ফিরে এসেছেন। তানভীর বেশ ভালোই সময় কাটাচ্ছিলেন।

একদিন বিকেলে তানভীর আর তাঁর কাজিন দুজনে বাজারে আড্ডা দিতে গেলেন। অনেকক্ষণ গল্পগুজব করে হাঁটতে হাঁটতে বাজারের শেষ প্রান্তে চলে আসলেন। সেখানে সোজা রাস্তার পাশে একটু নিচে দূরে কিছু চিমনি দেখা যাচ্ছে। ইটভাটার চিমনি।

তানভীর দেখলেন কয়েকটা চিমনি বেশ পুরনো, ব্যবহার হয় না। আর কয়েকটায় মনে হচ্ছে আজও কাজ হয়েছে, হালকা ধোঁয়া আছে। তিনি কাজিনকে জিজ্ঞেস করলেন, "ইটভাটা এটা কোনটা?" কাজিন বললেন, "ছোটবেলায় তোকে নিয়ে এসেছিলাম মনে নেই? এখন অনেকটা ছোট হয়ে গেছে। এক্সটেনশন বন্ধ হয়ে গেছে।"

"কেন বন্ধ?" জিজ্ঞেস করলেন তানভীর।

কাজিন বললেন, "এটা গ্রামের এক প্রভাবশালী লোকের ছিল। সেখানে অনেক রকম ঘটনা হয়েছে, অনেক উল্টাপাল্টা কাজ হতো। এই কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থারা এসে একদম সিলগালা করে দিয়েছে। ওই জায়গায় আর কিছু হয় না। পাশের ভাটাটা এখনো চলে — ওটা আরেকজনের।"

তানভীর বললেন, "আচ্ছা, চলো যাই দেখি। অনেকদিন এই জায়গায় যাই না। বেশ মজাই লাগত।"

কাজিন বললেন, "যাবি? জায়গাটা ভালো না।"

"কেন, কী সমস্যা?" বললেন তানভীর। "মানুষজন যায় না বুঝিস না — ওই পাশের যে পুরনো ভাটা পড়ে আছে, ওই জায়গাটায় একদমই আর মানুষ লাগে না। অনেক ঘটনা হয়েছিল ওখানে। আর এই পাশের চালু ভাটাটাও এখন বন্ধ, মানুষ নেই, কাজকর্ম নেই, বেলা পড়ে গেছে।"

তানভীর বললেন, "আরে, চলো হেঁটে আসি। সুন্দর লাগে। আমি ছোটকালে গিয়েছিলাম, চারদিকে ইটের স্তূপ করা, মাটি দিয়ে ব্লক বানিয়ে রাখা — খুব সুন্দর।" কাজিন অনিচ্ছা সত্ত্বেও তানভীরের সাথে হাঁটা ধরলেন।

তাদের বন্ধুরা তখনো চায়ের দোকানে বসে আছে। এই দুজন হেঁটে হেঁটে নামতে লাগলেন। নামতে নামতে একদম সোজা চলে আসলেন। তানভীর দেখলেন, চালু ইটভাটায় এখনো ইটের স্তূপ সাজানো আছে। মাঝখানে গলির মতো পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। বেলা পড়ে যাচ্ছে, সূর্যের আলো নেমে আসছে। চিমনির গায়ে হালকা লালচে আলো পড়েছে। পুরনো ভাটার চিমনিগুলো কালচে হয়ে গেছে — ব্যবহার হয় না, বোঝাই যাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে তানভীর দেখলেন, একদিকে মাটির ব্লক বানিয়ে সাজানো আছে, ঠেলাগাড়ির মতো রাখা। বললেন, "এগুলো অনেকদিন দেখিনি রে। ছোটবেলায় দেখেছিলাম।" নদীর পানি দূরে চিকচিক করছে পরন্ত সূর্যের আলোয়।

কাজিন বলতে লাগলেন, "তুই ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?" তানভীর হেঁটে যাচ্ছিলেন পুরনো ভাটার দিকে। বললেন, "আরে, একটু দেখি — পুরান ভাটা কেমন আছে।"

কাজিন তাঁকে মানা করছিলেন, কিন্তু এই সময় কাজিনের ফোন এলো। ফোন ধরে কথা বলতে লাগলেন, আর এর মধ্যে তানভীর হেঁটে সামনে চলে গেলেন।

একসময় ইটের স্তূপ পেরিয়ে বের হয়ে দেখলেন খোলা জায়গায় বড় বড় ঘাস জমে আছে। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে চিন্তা করলেন, তারপর সামনে এগিয়ে গেলেন। সামনে একটা কালো ঘর দেখা যাচ্ছে — সম্ভবত এখান থেকেই সব কার্যক্রম পরিচালনা হতো। আর সামনেই ভাটা।

তানভীর হাঁটতে হাঁটতে ওই জায়গায় চলে গেলেন। ঘরটার কাছে পৌঁছে বোঝা গেল এখানেই কাজকর্ম হতো। ভাটার কাছে আসতেই হঠাৎ দেখলেন — একটা ছাউনির নিচে একটা মেয়ে দাঁড়ানো।

মেয়েটা লাল শাড়ি পরা। মাথায় ঘোমটা টেনে রেখেছে, মুখ ঢাকা। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। চোখ দুটো কেমন ঘোলাটে, আর পরন্ত সূর্যের আলো তির্যকভাবে পড়ায় চোখ থেকে যেন একটা গ্লেয়ার আসছে। সবুজ চোখ, টানা টানা কাজলদেওয়া, ডাগর।

তানভীরের কেমন যেন ঝিম লেগে উঠল। চোখগুলো দেখে তিনি অনেকটা সম্মোহিত হয়ে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। মুখটা দেখা যাচ্ছে না — মেয়েটা মুখ ঢেকে রেখেছে। তানভীর কিছু বলতেও পারছেন না, আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি যখন আরো কয়েক পা এগিয়ে গেলেন, মেয়েটা হঠাৎ ঘুরে হাঁটা দিল। ছাউনি ধরে ভাটার পেছন দিকে হেঁটে চলে গেল। ওই দিকটা অন্ধকার হয়ে গেছে — সূর্যের আলো আর পৌঁছাচ্ছে না।

তানভীর ভাটার একদম কাছে চলে এসেছেন। ভেতরে ঢুকবেন কিনা ভাবছেন, এই সময় দূর থেকে কাজিনের চিৎকার শুনলেন। "এই, তুই কোথায়? তুই এখানে নাকি?"

তানভীর ঘুরে দাঁড়ালেন। কাজিন এগিয়ে আসছেন। এসে বললেন, "তুই এখানে কী করছিস? ওখানে গেছিস কেন?" তানভীর বললেন, "আরে, আমি দেখতে এসেছি। ভাটা পড়ে আছে, অন্যরকম লাগছে। চলো ভেতরে একটু দেখি।"

কাজিন বললেন, "মাথা খারাপ নাকি? এখানে অনেক আজেবাজে ব্যাপার আছে। এই জায়গা পুরো সিল করে দিয়েছিল। উল্টাপাল্টা অনেক কিছু হয়েছে এখানে।"

তানভীর বললেন, "আচ্ছা, ওই যে একটা মেয়েকে দেখলাম — ওই পাশ দিয়ে হেঁটে গেল।" কাজিন বললেন, "তুই মেয়ে দেখেছিস? ওই পাশের ভাটার কেউ যদি এখানে আসে — আর কে এখানে কেন আসবে? চলো তাড়াতাড়ি।"

কাজিন তানভীরকে নিয়ে বের হলেন। পুরো ইটভাটার পথ দিয়ে বের হয়ে আসার মধ্যে সূর্য একেবারে নেমে গেছে। তানভীরের মাথায় কেন যেন ওই মেয়েটা ঘুরছে। সাধারণ মেয়ে দেখার অনুভূতি না — কেমন যেন ডিফারেন্ট মনে হয়েছে।

তারা ঘাটে পৌঁছানোর সময় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দূরে আকাশে সূর্যের লালিমা লেগে আছে, পানি ছলাত ছলাত করছে। নৌকায় অনেক মানুষ উঠছেন। তানভীর আর কাজিনও উঠে বসলেন।

অন্ধকার হয়ে এসেছে। তানভীর ভাবছেন ওই মেয়েটার কথা। কাজিনকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, "ওখানে কারো থাকার কথা আছে? ওই পাশে বাড়িঘর আছে?" কাজিন বললেন, "পাশের ভাটার লোকজনের হয়তো ঘরটর আছে দু-একটা। ওরা এখানে আসতেও পারে, নাও পারে। তুই কারেও দেখেছিস কী — চলো।" বলে কাজিন অন্য কথায় চলে গেলেন।

তানভীর অন্যমনস্কভাবে কাজিনের কথা শুনছেন। নৌকা নদীর উপর দিয়ে চলছে। মাঝখানে মাঝি হারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছেন। আকাশে হালকা লালিমা, চারদিকে অন্ধকার।

একসময় নৌকা পাড়ে ভিড়ল। খ্যাচ করে পাড়ে ঠেকল। মাঝি লগি দিয়ে আটকে সবাইকে নামাতে লাগলেন। মানুষ নেমে যাচ্ছেন। কাজিন নামলেন, তানভীরও নামলেন।

নামতে নামতে তানভীর চোখের কোণ দিয়ে দেখলেন — নৌকার একপাশে ওই মেয়েটা বসা! ঠিক একইভাবে মাথায় কাপড় দেওয়া, তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। হারিকেনের আলোয় দেখলেন এটা।

এক সেকেন্ডের জন্য চোখে পড়েছে। কাজিন ডাক দিলেন — "এই, কিরে?" তানভীর মাথা ঘুরিয়ে বললেন, "দাঁড়া।" আবার নৌকার দিকে তাকালেন। মেয়েটা নেই।

তানভীর কাজিনকে বললেন, "আরে, নৌকার মধ্যে মেয়েটাকে দেখলাম এইমাত্র।" কাজিন বললেন, "তোর মাথা গেছে ব্যাটা। কী দেখছিস তুই — চলো চলো।" তানভীর বারবার পেছন ফিরে দেখলেন — নৌকায় ওই মেয়ে নেই। যারা নেমেছেন তারা চলে গেছেন। এত দ্রুত কোথায় গেল? এক সেকেন্ডের মধ্যে কীভাবে?

হাঁটতে হাঁটতে বাড়িতে আসার পথে কাজিন বললেন, "কালকে তোকে নিয়ে নৌকায় হাটে যাব। আমাদের নৌকা আছে — কালকে সকাল ১০টার দিকে ঘাটে বেঁধে রাখব।" তানভীর বললেন, "আচ্ছা ঠিক আছে।"

বাড়ির কাছে আরেক বন্ধুর সাথে দেখা হলো — সে ডাব নিয়ে এসেছে। ডাব খেয়ে বাড়ির দিকে গেলেন। তানভীর কাজিনকে বললেন, "রাতে নৌকাটা আমাদের ঘাটে বেঁধে রেখো।" কাজিন বুঝিয়ে দিলেন কোথায় যেতে হবে।

রাতে তানভীর তাঁর ঘরে এলেন। শুয়ে পড়লেন। অনেক ক্লান্তি। ভাবছেন আজকে কোথায় কোথায় গেলেন, কী দেখলেন। চোখে ঘুম লেগে আসছে।

এই সময় মনে হলো ঘরের সামনে থেকে কেউ হাঁটাচলা করছে। বারান্দায় রাখা বেতের মোড়ায় মচমচ শব্দ শুনলেন। রাতের বেলা তাঁকে যে ঘরটায় থাকতে দেওয়া হয়েছে — এটা কাচারি ঘর, এক্সটেনশন, মূল ঘর থেকে একটু দূরে। এই সময় এখানে কারো থাকার কথা না।

অনেকক্ষণ ধরে শব্দ পাচ্ছেন। ঘুম ভেঙে গেছে, আর ঘুম আসছে না। একসময় উঠলেন। দরজার পাশে ফাঁকা দিয়ে বাইরে উঁকি দিলেন। বারান্দা পুরো ফাঁকা। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে উঠানে — এতটাই উজ্জ্বল যে দিনের মতো মনে হচ্ছে।

তানভীর আস্তে করে দরজা খুললেন। বাইরের ঠান্ডা বাতাস লাগল, গাছগাছালির ঘ্রাণ আর পানির ঘ্রাণ — নদী কাছেই।

বারান্দায় এসেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো। মনে হচ্ছে তিনি একা নন — বারান্দায় আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে। বারান্দাটা লম্বা — পাশে আরেকটা তালাবন্ধ ঘর আছে, সেটার সামনের অংশটাও বারান্দার মধ্যে পড়ে। ওই কর্নারটা দেখা যাচ্ছে না।

তানভীর হেঁটে বারান্দার ওই কর্নারে গেলেন। যাওয়ার সময় তালাবন্ধ ঘরের ভেতর থেকে শব্দ মনে হচ্ছে — কেউ চলাফেরা করছে। তিনি তালাটা ধরে দেখলেন — হ্যাঁ, তালা মারা।

এই সময় মনে হলো বারান্দার একদম নিচে কেউ আছে। ফট করে তাকালেন।

চাঁদের আলোয় — সেই লাল শাড়ি পরা মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক সেইভাবেই — ঘোমটা টানা, মুখের কাছে কাপড়, শুধু চোখ দুটো বেরিয়ে আছে। এই অন্ধকারে চোখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু লাল শাড়িটা চাঁদের আলোয় জলজল করছে।

তানভীরের শরীর দিয়ে ভয়ের স্রোত নেমে গেল। রাতের বেলা একই শাড়ি পরা মেয়ে এখানে কী করছে? তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন।

তখন একটা হাসির শব্দ শুনলেন — খিলখিল হাসি।

এই হাসি শোনার পরই তানভীরের মাথা ঝিম করে উঠল। এক ঝলক বাতাস এলো ওই দিক থেকে — মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গে একটা চাপা ফুলের মতো ঘ্রাণ। আর সাথে সাথে তাঁর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।

তানভীরের কাছে মনে হলো তিনি এই জগতে নেই — অন্য একটা জগতে আছেন। সবকিছু কেমন গ্লো করছে। মেয়েটার শাড়ি মনে হচ্ছে আলো ঠেলে বেরোচ্ছে। তানভীর ওই মেয়েটার দিকে হেঁটে যেতে লাগলেন। মেয়েটা কাছে আসার সাথে সাথে ঘুরে গেল, হাঁটা শুরু করল।

তানভীর তাকে ফলো করতে লাগলেন। কেন করছেন তা বুঝতে পারছেন না। আর তাঁর মাথায় বারবার আসছে — বাড়ির ঘাটে যেতে হবে। কাজিন যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, ঠিক সেইভাবেই হেঁটে গেলেন।

বাড়ির ঘাটে পৌঁছে দেখলেন তাদের বড় নৌকাটা বাঁধা আছে। মেয়েটা সেই নৌকায় উঠে গেল। তানভীরও উঠলেন। নিজের অজান্তেই নৌকার দড়ি খুলে দিলেন। স্রোতের টানে নৌকা আস্তে আস্তে নদীতে বেরিয়ে গেল।

তানভীর দেখছেন নৌকার অপর মাথায় ছইয়ের ওপারে মেয়েটা বসে আছে। আবছা দেখা যাচ্ছে। নিজের অজান্তেই বৈঠা তুলে নৌকা বাইতে শুরু করলেন। তানভীর আগে থেকেই নৌকা বাইতে পারতেন — নানাবাড়িতে এসে অনেকবার নৌকা নিয়ে ঘুরেছেন।

নৌকা বাইতে বাইতে একসময় দেখলেন সেই ঘাটের কাছে চলে এসেছেন — যেই ঘাট থেকে আগে নদী পার হয়েছিলেন। নৌকা পাড়ে ঘ্যাচ করে বিঁধল। নিজের অটো রিফ্লেক্সেই গ্রাপেল ছুড়ে আটকালেন, নৌকা বেঁধে নামলেন।

নেমে দেখলেন মেয়েটা সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। তানভীর তাকে ফলো করলেন। হাঁটতে হাঁটতে কোথায় এলেন? সেই পুরনো ইটভাটায়।

সেখানে এসে তানভীরের কাছে মনে হলো জগতটা আরও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সবকিছু অন্যরকমভাবে দেখছেন — প্রতিটা জিনিসের প্রান্ত উজ্জ্বল, বাকিটা ধোঁয়াধোঁয়া।

ইটভাটায় ঢুকে দেখলেন মাঝখানে অনেকগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে। স্বাভাবিক মানুষের মতো না — গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা হেঁটে তাদের মাঝখানে চলে গেল। তানভীর আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছেন।

মানুষগুলো হাঁটা শুরু করল সামনে। তানভীরও ফলো করলেন। একসময় দেখলেন সবাই সেই ঘরটার দিকে যাচ্ছে — যেখানে ইট পোড়ানো হতো। একে একে সবাই দরজা দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে।

তানভীরও হেঁটে এগিয়ে গেলেন। ঘরের কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গেছেন। সেই অন্ধকার দরজার ওপারে দেখলেন মেয়েটা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে। আস্তে করে মুখের কাপড় নামাল। তানভীরের কাছে মনে হলো অসাধারণ সুন্দর একটা মুখ তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসছে।

তানভীর ঢুকে যাবেন — এই সময় পেছন থেকে কারা যেন তাঁকে জাপটে ধরল। টেনে পেছন দিকে নিয়ে মাটিতে ফেলল।

মাটিতে পড়ার সাথে সাথে মনে হলো ঘুম ভেঙে উঠলে যেরকম লাগে — মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন। দেখলেন তিনি সেই পুরনো ইটভাটায় শুয়ে আছেন। পাশে দুজন মানুষ।

"মিয়া, আপনি এখানে রাতের বেলা এলেন কীভাবে? কোথা থেকে এলেন? এখানে কী করছিলেন? আপনি তো যাচ্ছিলেন সেখানে!"

তানভীর বললেন, "আমি জানি না কীভাবে এলাম।" তারা বললেন, "এদিকে আসুন। হাঁটতে পারবেন?"

তানভীর পারলেন। তাঁকে ধরে ওই দুজন নিয়ে আসলেন। দেখলেন নতুন ইটভাটার পাশে একটা টানা ঘর, সেখানে কিছু শ্রমিক থাকেন। ট্রাক থামানো, লোকজন ইট তুলছেন।

সেখানে বসতে দিলেন, পানি দিলেন। তানভীর পানি খেলেন। মুখে পানি ছিটানো হলো। তিনি বললেন, "আমি জানি না কীভাবে এলাম।" নানাবাড়ির ঠিকানা বললেন। ওরা বললেন, "নদী পার হয়ে এখানে রাতের বেলা এলেন কীভাবে?" তিনি বললেন, "নৌকায় এলাম।" "রাতের বেলা একা নৌকায়? কীভাবে?" "জানি না। মনে হলো কেউ আমাকে নিয়ে এসেছে।"

সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কি আগে এখানে এসেছিলেন?" তানভীর বললেন, "হ্যাঁ, গতকাল বিকেলে।" বৃদ্ধ বললেন, "এই তো কাম হয়েছে। সন্ধ্যার সময় এখানে আসতে নেই। জায়গাটা খারাপ। আসুন, আমাদের ঘরে আসুন।"

তানভীর বললেন, "না, আমি নৌকা নিয়ে চলে যাব।" তারা বললেন, "না না, রাতের বেলা নৌকা নিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। আসুন।" তাঁকে ঘরে নিয়ে বসালেন।

তানভীরের কাছে ফোন ছিল না। অনেক কষ্টে কাজিনের নম্বর মনে করলেন। বয়স্ক লোকটার মোবাইল থেকে কল দিলেন। রাতে কেউ ধরলেন না। বললেন, "পরে দেব।"

মুরুব্বি দোয়া-দরুদ পড়ে ফু দিলেন। বললেন, "আপনার উপর কোনো খারাপ আছর হয়েছিল। আপনি ঘুমের মধ্যে এখানে এসেছেন।" তানভীর আধুনিক মানুষ, পড়াশোনা করেন — এসব বিষয়ে সেভাবে বিশ্বাস নেই। তবু নিজেই অবাক হলেন — স্বপ্নের মতো এখানে চলে এসেছেন, নৌকা বেয়ে এসেছেন।

ফজরের আজানের অনেকক্ষণ পর কাজিন কল ব্যাক করলেন। শুনলেন তানভীর রাতে ইটভাটায় চলে গেছেন। সবাই অবাক।

তানভীর ওখানে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙলে দেখলেন কাজিন, মামা আর আরো দু-একজন এসেছেন। কাজিনকে বললেন সব। মামাকে বললেন, "মামা, মাথাটা কেমন করছে।"

তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো। মামা গ্রামের মাওলানা সাহেবকে ডাকলেন। তিনি এসে দেখে বললেন, "ছেলে ওই জায়গায় গেছে — ওই জায়গা ভালো না। মাগরিবের পরে কিছু করা যায় কিনা দেখি।"

মাগরিবের পরে মাওলানা সাহেব বাসায় রুকাইয়া করলেন। মামা, মামি, কাজিনরা সবাই থাকলেন। রুকাইয়া করতে গিয়ে দেখা গেল তানভীরের উপর কিছু হাজির হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেল — ওই পুরনো পরিত্যক্ত ইটভাটায় খারাপ জিন থাকে। যে জায়গায় অনেক অঘটন হয়েছে, পরিত্যক্ত জায়গায় তারা থাকে। তারা প্রথমে বলার চেষ্টা করল যে ওখানে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল, তাদের স্পিরিট এসেছে। কিন্তু মাওলানা সাহেব ভালোমতো জিজ্ঞাসাবাদ করলে স্বীকার করল — তারা ওখানকার খারাপ জিন। তানভীর যখন আগে বিকেলে এসেছিলেন, তাদের একটি মেয়ে জিন তাঁর উপর নজর দিয়েছিল এবং রাতে তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

তাঁকে ঘরের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল? মেরে ফেলা। একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মেরে ফেলবে — এতে ওই জায়গার বদনাম আরও প্রসিদ্ধ হবে।

তানভীরকে ভালোমতো ঝেড়ে, রুকাইয়া করে ওদের থেকে আলাদা করা হলো। মাওলানা সাহেব বললেন, "ছেলেকে আপাতত এখানে রাখবেন না। কালকেই ঢাকায় পাঠিয়ে দিন।" দোয়া-দরুদ পড়ে ফু দিলেন, পড়া পানি দিলেন, পড়া তেল দিলেন। বললেন, "এই এলাকা ছাড়ার আগ পর্যন্ত শরীরে তেল মালিশ করিয়ে দিন। জায়গাটা খুব খারাপ।"

পরদিন কাজিন তানভীরকে একদম ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসলেন। ঢাকায় আসার পরে ওসব স্বপ্নে আর দেখতেন না। কিন্তু অনেকদিন দুর্বল ছিলেন। রাতের বেলা হলে হাঁটাচলা করতেও ভয় লাগত। হলের কিছু কিছু জায়গায় ছাত্ররা আগে থেকেই ভয় পেত — তানভীরও ওসব জায়গা দিয়ে চলতে ফিরতে ভয় পেতেন।

এই ব্যাপারটা অনেকদিন ছিল তানভীরের মধ্যে। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে কেটে যায়।

এই ছিল তানভীর হোসেনের শেয়ার করা ঘটনা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url