মৃত্যুর লিস্ট, ইফরিতের খাতা bhuter golpo
আজকের এই ঘটনাটা খুবই অদ্ভুত। ঘটনাটি ঝন্টু ভাই আমার সাথে শেয়ার করেছেন। ঘটনাটি মূলত ঝন্টু ভাইয়ের বাবা মিন্টু চাচার। আমি মিন্টু চাচার ভাষাতেই বলছি। বলছেন মিন্টু চাচা।
এই ঘটনাটা তখনকার, যখন আমি সবেমাত্র কলেজে পড়ি। সম্ভবত ১৯৮৮ বা ১৯৮৯ হবে। ঘটনার শুরুটা হয়েছিল খুব সাধারণভাবেই। তখন শীতকাল আসি আসি করছে। আমাদের গ্রামের এক মুরুব্বি তোফাজ্জল চাচা হঠাৎ করে মারা গেলেন। বয়স হয়েছিল, তাই সবাই ভাবলো হার্ট অ্যাটাক বা ন্যাচারাল ডেথ। আমরা সবাই মিলে তার জানাজা দিলাম, দাফন করালাম। গ্রামের মানুষ হিসেবে মৃত্যুর সাথে আমাদের পরিচয় নতুন না। কিন্তু অস্বাভাবিকতাটা শুরু হলো ঠিক তার তিনদিন পর।
তোফাজ্জল চাচার কুলখানির আয়োজন চলছে, রান্নাবান্না হচ্ছে। ঠিক সেই সময় মসজিদের মাইকটা ক্যাচ ক্যাচ করে উঠলো। গ্রামের মানুষ চমকে উঠলো, কারণ জোহরের আজানের এখন অনেক দেরি। অসময়ে মসজিদের মাইক অন হওয়া মানে কোনো দুঃসংবাদ। মাইকে মুয়াজ্জিন সাহেবের গলা শোনা গেল, "সম্মানিত এলাকাবাসী, একটি শোক সংবাদ। আমাদের পাড়ার গোলাম মাওলা ভাই আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।"
গোলাম মাওলা ভাই সুস্থ-সবল মানুষ। আগের দিন বিকেলেও আমি তাকে হাটে বাজার করতে দেখেছি। আমি আর আমার বন্ধুরা দৌড়ে গেলাম তার বাড়িতে। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড, বাড়ির মহিলারা কান্নাকাটি করছেন, আর গোলাম ভাই বারান্দায় শুয়ে আছেন। তার ছেলে বলল, "বাবা সকালে নাস্তা করে একটু শুয়েছিলেন, আর উঠেননি — ঘুমের মধ্যেই সব শেষ।" তখনো আমরা কেউ সন্দেহ করিনি। ভাবলাম, হায়াত-মউত আল্লাহর হাতে। কাকতালীয়ভাবে পরপর দুজন মারা গেলেন।
কিন্তু আমাদের ভুল ভাঙতে শুরু করল যখন গোলাম মাওলা ভাইয়ের দাফনের দিনেই আবার মসজিদের মাইক বেজে উঠলো, ঠিক একইভাবে। দাফনের খাটিয়া যখন গোরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখনই মাইকে ঘোষণা এল — "আলিমুদ্দিন ব্যাপারী মারা গেছেন।" এবার গ্রামের মানুষের বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। পরপর তিনজন, তাও আবার ঠিক সেই দিনেই যেদিন আগের জনের দাফন হচ্ছে। একটা কেমন চেইন রিঅ্যাকশন।
গ্রামের চায়ের দোকানগুলোতে মাচায় বসে থাকা মুরুব্বিদের মুখে একটাই কথা, "ঘটনা কি? বাতাস কি খারাপ হইছে?" আমরা যারা তরুণ ছিলাম — মানে আমি, আমার বন্ধু সজল, রফিক — আমরা এটাকে পাত্তা দিতে চাইলাম না। আমরা বললাম, "আরে ধুর, সব কুসংস্কার। হার্ট অ্যাটাক তো হতেই পারে।" কিন্তু আমাদের সেই তথাকথিত বিজ্ঞানমনস্ক ভাব বেশিক্ষণ টিকলো না। চতুর্থ মৃত্যুটা হলো আমাদের নিজের খুব কাছের এক আত্মীয়।
আমার ফুপা সুস্থ মানুষ। রাতে এশার নামাজ পড়ে গেলেন, তারপর একটু বুকে ব্যথা হলো। হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নেওয়ার আগেই সব শেষ। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ফুপার লাশ গোসল করানোর সময় আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। আমি নিজ চোখে দেখেছি, তার গলার ঠিক নিচটায় যেখানে শ্বাসনালী থাকে, সেখানে একটা কালো গোল দাগ। মনে হচ্ছে কেউ যেন আগুনের ছেঁকা দিয়েছে, অথবা খুব সরু কোনো দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছিল। দাগটা কালচে নীল রঙের।
আমি ভয়ে ভয়ে পাশে থাকা হুজুরকে জিজ্ঞেস করলাম, "হুজুর, এই দাগটা কিসের?" হুজুর গম্ভীর মুখে বললেন, "বোধহয় রক্ত জমে গেছে বাবা। মরা মানুষের শরীরে অনেক কিছুই হয়।" কিন্তু আমি জানি, ওটা সাধারণ রক্ত জমাট বাঁধা ছিল না। কারণ পরে আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, আগের যে তিনজন মারা গেছেন তাদের সবার গলাতেই এরকম অস্পষ্ট কালো দাগ ছিল। যেন মৃত্যুর সিলমোহর মেরে দেওয়া হয়েছে।
চারজন মানুষ, মাত্র বারো দিনের ব্যবধানে। গ্রামের অবস্থা তখন ভয়াবহ। মাগরিবের আজান দেওয়ার সাথে সাথে পুরো গ্রাম যেন বাস্তব কবরস্থানে পরিণত হয়ে যেত। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের ডাক। যে চায়ের দোকানে রাত বারোটা পর্যন্ত আড্ডা চলতো, সেখানে সন্ধ্যা সাতটার পর আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না। সবাই ভয়ে দরজায় খিল দিয়ে বসে থাকতো। মনে হতো আজরাইল বুঝি লিস্ট ধরে ধরে আমাদের গ্রামে হানা দিয়েছে।
এরই মধ্যে একদিন সকালে গ্রামের সোলেমান হাজী সাহেব — খুবই পরহেজগার মানুষ — মসজিদের বারান্দায় বসে যবুথবু হয়ে কাঁপছেন। ফজরের নামাজের পর মুসল্লিরা তাকে ঘিরে ধরলো, "কি হয়েছে হাজী সাহেব? শরীর খারাপ?" হাজী সাহেব ফেলফেল করে তাকিয়ে বললেন, "সর্বনাশ হয়ে গেছে রে, সর্বনাশ হয়ে গেছে।" সবাই ধরাধরি করে তাকে শান্ত করলেন। একটু পানি খাওয়ার পর তিনি যা বললেন তাতে আমাদের প্রত্যেকেরই মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল।
তিনি বললেন, "আমি কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি, আমাদের গ্রামেরই কেউ — খুব পরিচিত কেউ — শয়তানের সাথে চুক্তি করেছে। সে মানুষের মাথা বিক্রি করেছে। আমি স্বপ্নে দেখলাম রক্তে ভাসা একটা ঘরের মধ্যে বসে কেউ একজন নাম কাটছে, আর একটা বিকটদর্শন ছায়ামূর্তি তাকে বলছে — আমার আরো চাই, পনেরোটা পুরুষ, তেরোটা নারী আর এগারোটা শিশু, তবেই তোর আশা পূর্ণ হবে।" হাজী সাহেবের কথা শুনে অনেকে বলল, স্বপ্ন তো স্বপ্নই। কিন্তু আমরা যারা গত কয়দিনের ঘটনা দেখেছি তারা এটাকে শুধু স্বপ্ন বলে উড়িয়ে দিতে পারলাম না।
হাজী সাহেব কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "তোরা সাবধান থাক। নিজেদের পরিবারকে দেখে রাখ, বিশেষ করে বাচ্চাদের। গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে গেছে, কোনো এক আপদ আমাদের গ্রামে ভর করেছে।" হাজী সাহেবের এই স্বপ্নের কথা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়লো। পনেরোজন পুরুষ, তেরোজন নারী আর এগারোটা শিশু — তার মানে কি এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না? এখন পর্যন্ত সাতজন পুরুষ মারা গেছে, তার মানে কি আরো আটজন বাকি? এরপর কি মহিলাদের পালা? গ্রামের মহিলারা ভয়ে বাচ্চাদের ঘরের বাইরে বের হতে দিচ্ছিল না। এমনকি আমরা যারা যুবক, আমাদেরও মায়েরা সন্ধ্যার পর বাইরে যেতে দিত না।
কিন্তু কতদিন আর এভাবে ঘরে বসে থাকা যায়। একদিন রাতে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম যে এভাবে বসে থেকে লাভ নেই। যদি সত্যিই কেউ কোনো কুফরি কালাম করে থাকে, তবে তাকে খুঁজে বের করতে হবে। আর যদি এটা কোনো চোর-ডাকাতের কাজ হয়, তবে পাহারা দেওয়া দরকার। আমরা ঠিক করলাম গ্রামের পুরনো প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় আমরা রাত জাগবো। ওটা গ্রামের প্রায় মাঝখানে, সেখান থেকে চারদিকে রাস্তা দেখা যায়।
রাত তখন প্রায় বারোটা বাজে। আমরা পাঁচ-ছয়জন বন্ধু, সাথে টর্চলাইট, লাঠিসোটা আর সাহস জোগানোর জন্য ফ্লাক্সের চা। চারদিক নিঝুম। গ্রামের রাস্তাঘাট অন্ধকার। তখনো গ্রামে কারেন্ট থাকলেও লোডশেডিং ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, আর ওই রাতে তো কারেন্টই ছিল না। আকাশে ছিল মরা চাঁদ, সে আবছা আলোয় গাছপালাগুলোকে মনে হচ্ছিল একেকটা অতিকায় দৈত্য।
আমরা নিচু গলায় কথা বলছিলাম। হঠাৎ আমার বন্ধু সজল কনুই দিয়ে আমাকে গুঁতো দিল, "এই মিন্টু, চুপ কর। আমি বললাম, কি হয়েছে? ও বলল, ওদিকে তাকা — ওই যে বড় পুকুরটার পাড়ে।" আমাদের স্কুলের উল্টো দিকে একটা বিশাল দিঘি ছিল। দিঘির পাড়ে অনেকগুলো পুরনো হিজল আর বাঁশঝাড় ছিল। আমি টর্চ মারতে যাচ্ছিলাম, সজল আমার হাত চেপে ধরল, "আলো জ্বালাস না, এমনিই দেখ।" আমি চোখ সরু করে অন্ধকারের দিকে তাকালাম। দিঘির পাড়ে একটা হিজল গাছের নিচে আবছামতো কিছু একটা নড়ছে।
প্রথমে মনে হলো কোনো কুকুর বা শিয়াল হবে। কিন্তু ভালো করে তাকাতেই আমাদের গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল — ওটা কোনো পশু নয়, ওটা একটা মানুষ। এবং মনে হচ্ছে একজন মহিলা। এত রাতে এই খুটখুটে অন্ধকারে পুকুর পাড়ে একটা মহিলা স্বাভাবিকভাবে আসার কথা না। আর তার নড়াচড়াটা — সেটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের নড়াচড়া ছিল না। ছায়াটা অদ্ভুতভাবে দুলছিল, যেন বাতাসের সাথে সাথে শরীরটাকে তোলাচ্ছে। হাতগুলো শরীরের দুই পাশে ঝুলে আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে হাত তুলে এমন ভঙ্গি করছে যেন সে অদৃশ্য কারো সাথে কথা বলছে বা কাউকে আলিঙ্গন করতে চাইছে।
আমার পাশে থাকা হারুন কাকা — যিনি আমাদের দলের লিডার গোছের ছিলেন — তিনি ফিসফিস করে বললেন, "বিসমিল্লাহ ভরসা, সবাই ভালো করে খেয়াল কর, এই মহিলা কী ধরনের কাপড় পরে আছে।" আমি চোখ কুঁচকে আবার তাকালাম। চাঁদের আলো মেঘের আড়াল থেকে একটু বের হতেই দৃশ্যটা কিছুটা পরিষ্কার হলো, আর দেখতে পেলাম মহিলাটি একটা কালো কাপড় পরে আছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো তার নাচের ভঙ্গি। তিনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের অক্ষের উপর ঘুরছেন। হাত দুটো বুকের কাছে এনে এমনভাবে নাড়ছেন যেন কোনো বাচ্চাকে আদর করছেন। আবার পরক্ষণেই হাত দুটো আকাশের দিকে তুলে অদ্ভুতভাবে মোচড়াচ্ছেন। তার চুলগুলো খোলা, মুখটা চুলের আড়ালে ঢাকা। কিন্তু তার শরীরের চামড়া — দূর থেকেও মনে হচ্ছিল চামড়াটা কেমন যেন ফ্যাকাসে, মরা মানুষের মতো সাদা। রফিক ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, "কে ওটা?" হারুন কাকা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "মানুষ না, অথবা মানুষ হলেও এখন আর মানুষের পর্যায়ে নেই। তাওরা বা ওই টাইপের কোনো বিষাদ সাধনা করতেছে।" আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তাওরা কি, কাকা?" তিনি বললেন, "ওসব পরে শুনবে, এখন চুপ থাক।"
আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছি। মহিলাটি নাচতে নাচতে এবার গ্রামের রাস্তার দিকে এগোতে শুরু করল। তার হাঁটার ভঙ্গিটাও স্বাভাবিক না — পাগুলো যেন মাটির সাথে লেগে নেই, মনে হচ্ছে সে মাটির উপর দিয়ে ভেসে ভেসে আসছে। আর প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে সাথে সে তার মাথাটা ঝটকা দিয়ে এপাশ-ওপাশ করছে।
হঠাৎ হারুন কাকা বললেন, "ওকে ফলো করতে হবে। দেখতে হবে ও কার বাড়িতে ঢোকে। কার বাড়িতে ঢুকবে বা কার বাড়ির সামনে গিয়ে থামবে, বুঝবে পরের টার্গেট সেই বাড়ির কেউ।" ভয়ে আমাদের জান শেষ, কিন্তু কৌতূহল কাজ করছিল। আমরা বিসমিল্লাহ বলে পা টিপে টিপে স্কুলের বারান্দা থেকে নামলাম। মহিলাটি আমাদের থেকে প্রায় একশো হাত দূরে, সে মেইন রাস্তা ধরে গ্রামের পশ্চিম পাড়ার দিকে যাচ্ছে। আমরা রাস্তার ধারে ঝোপঝাড়ের আড়াল দিয়ে তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। পরিবেশটা তখন এত থমথমে যে নিজের হৃদপিণ্ডের শব্দ আমি নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে মহিলাটি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। আমরাও সাথে সাথে মাটিতে বসে পড়লাম। সে কি আমাদের দেখে ফেলেছে? সে দাঁড়িয়ে আছে একদম স্ট্যাচু হয়ে, তার ঘাড়টা একটু কাত করা। মনে হলো সে বাতাসের গন্ধ শুঁকছে। তারপর সে একটা বিকট শব্দ করল। মানুষের কণ্ঠা দিয়ে এমন শব্দ বের হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। শব্দটা অনেকটা বিড়ালের ঝগড়ার সময় করা শব্দের মতো, কিন্তু অনেক বেশি ভারী এবং কর্কশ। মনে হলো যেন গলার ভেতর থেকে কেউ প্লেট দিয়ে ছিঁড়ে শব্দটা বের করেছে। শব্দটা শুনে গ্রামের কুকুরগুলো পর্যন্ত ডাকার সাহস পেল না, সবাই চুপ।
সে আবার হাঁটতে শুরু করল। এবার তার গতি বেড়ে গেছে। সে সোজা গিয়ে দাঁড়ালো পশ্চিম পাড়ার একটা বাড়ির সামনে। বাড়িটা আমাদের সবার চেনা — গ্রামের হাই স্কুলের শিক্ষক বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ি। বদরুদ্দিন স্যার অত্যন্ত ভালো মানুষ, তার স্ত্রী মরিয়ম ভাবীও খুবই পর্দানশীল মহিলা। তাদের পাঁচটা ছেলেমেয়ে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ওই মহিলাটি বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আবার সেই অদ্ভুত নাচ শুরু করল।
সে তার হাত দুটো গেটের দিকে বাড়িয়ে দিল, যেন অদৃশ্য কোনো দরজা খুলছে। আর অবাক কাণ্ড — ভেতর থেকে বন্ধ করা লোহার গেটটা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে আপনাআপনি খুলে গেল। কোনো চাবি লাগলো না, কোনো ধাক্কা লাগলো না। আমরা সবাই একে অপরের দিকে তাকালাম। সজল আমার হাত খামচে ধরল, "মিন্টু, এ কি দেখছিরে ভাই? চিন নাকি?"
মহিলাটি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আমরাও সাহস করে আরেকটু এগলাম। স্যারের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর সে উঠোনের মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসলো, মাটি থেকে কিছু একটা তুলল, সেটা সে নিজের মুখে মাখতে শুরু করল, আর বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে লাগল। তার ভাষা আমরা বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু টোনটা ছিল মারাত্মক আগ্রাসী। "হাসছে, নিয়ে যাবে, কালি, রক্ত" — কথাগুলো বাতাসের সাথে ভেসে আসছিল।
হঠাৎ হারুন কাকা ফিসফিস করে বললেন, "সর্বনাশ, ওতো ঘরের দিকে যাচ্ছে। আজকে কি কাউকে মারবে নাকি?" আমরা দেখলাম মহিলাটি হামাগুড়ি দিয়ে ঠিক চতুষ্পদ জন্তুর মতো বদরুদ্দিন স্যারের শোবার ঘরের জানালার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জানালার গ্রিল ধরে সে উঁকি দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে জানালার ভেতর থেকে একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ এল — মনে হয় স্যারের ছোট মেয়েটা কেঁদে উঠেছে।
আর সাথে সাথে ওই মহিলাটা জানালার গ্রিল থেকে ছিটকে সরে এল, যেন তাকে কেউ ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। সে হিস হিস করে উঠল, ঠিক সাপের মতো। আমরা তখন কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। চিৎকার দেব নাকি গিয়ে ধরবো? কিন্তু ওই অবস্থায় একটা অস্বাভাবিক শক্তিধর মহিলার সামনে যাওয়ার সাহস আমাদের ছিল না। মহিলাটি কিছুক্ষণ উঠোনে ছটফট করল। তারপর হঠাৎ করে সে উঠে দাঁড়ালো এবং বাড়ির পেছনে জঙ্গল দিয়ে দৌড় দিল। দৌড়ানোর সময় তার গতি ছিল অকল্পনীয় — চোখের পলকে সে অন্ধকারের সাথে মিশে গেল।
আমরা তখন বদরুদ্দিন স্যারের গেটের বাইরে ঝোপের আড়ালে বসে থরথর করে কাঁপছি। হারুন কাকা ঘামছেন। তিনি বললেন, "এখান থেকে ভাগ, কাল সকালে সবাইকে জানাতে হবে। বদরুদ্দিন স্যারের মহাবিপদ।" আমরা সে রাতে আর পাহারায় থাকিনি, সোজা যার যার বাড়িতে গিয়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে সেই দৃশ্য — ফ্যাকাসে চামড়া আর ওই জন্তুর মতো হাঁটা — বারবার ভেসে উঠছিল।
পরদিন সকালে গ্রামের মোড়ল সাহেব আর মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে আমরা সব খুলে বললাম। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি, কিন্তু আমরা যখন পাঁচজন কসম কেটে বললাম, তখন পরিস্থিতি গম্ভীর হয়ে গেল। ইমাম সাহেব চিন্তিত মুখে বললেন, "তোমরা ঠিক দেখেছো তো? ওটা বদরুদ্দিন মাস্টারের বাড়িতে ঢুকেছিল?" মাতব্বর সাহেব বললেন, "ব্যাপারটা সুবিধাজনক মনে হচ্ছে না, বদরুদ্দিন তো ভালো মানুষ, কিন্তু তার বাড়িতেই বা এই আপদ কেন যাবে?" কথাটা শেষ করলেন না, তবে গ্রামের মানুষের মুখে মুখে কথাটা ঘুরতে লাগলো।
সেদিন বিকেলেই গ্রামে জরুরি সালিশ বসল। বদরুদ্দিন স্যারকে ডাকা হলো। বেচারা কিছুই জানেন না, তিনি অবাক হয়ে বললেন, "আপনারা এসব কি বলছেন? আমার বাড়িতে এমন মহিলা অসম্ভব। আমি বা আমার স্ত্রী কিছুই টের পাইনি।" কিন্তু গ্রামের মানুষ তখন উত্তেজিত। গত মাসে সাতটা লাশ পড়েছে, সবার মনে বারুদ জমে আছে। একজন যুবক দাঁড়িয়ে বলল, "মাস্টার সাব, সাধু সাজবেন না। আপনার বাড়িতেই ডাইনি ঢুকছে, তার মানে আপনার সাথে তার কোনো কানেকশন আছে।"
বদরুদ্দিন স্যার অপমানে লাল হয়ে গেলেন, "আমি শিক্ষক মানুষ, আমাকে আপনারা এসব জঘন্য অপবাদ দিচ্ছেন?" পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছিল। ইমাম সাহেব থামালেন, বললেন, "শান্ত হও সবাই। কোনো প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষারোপ করা গুনাহর কাজ। আজ রাতে আমরা আবার পাহারা দেবো, আরো বেশি মানুষ নিয়ে। যদি আজকেও এই আপদ আসে, তবে তাকে হাতেনাতে ধরবো। তারপর দেখা যাবে আসল কালপ্রিটকে।"
সেই রাতে গ্রামে যেন কারফিউ জারি হলো। প্রতিটা মোড়ে লাঠিসোটা নিয়ে যুবকরা দাঁড়িয়ে গেল। বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ির আশেপাশেও লুকিয়ে রইল দশ-বারোজন, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। রাত গভীর হতে লাগলো — বারোটা, একটা, দুইটা, কিছু নেই, সব শান্ত। মশা কামড়াচ্ছে কিন্তু কেউ নড়ছে না।
রাত যখন প্রায় তিনটা, তখন হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ির ঠিক উল্টো দিকের আম গাছের ডাল মটমট করে ভেঙে পড়ল। অথচ কোনো ঝড় বাতাস ছিল না। সবাই চমকে ওদিকে টর্চ মারলো। আর ঠিক সেই সুযোগে আমাদের পেছনের দিক থেকে একটা করুণ আর্তচিৎকার ভেসে আসলো, "বাঁচাও, কে আছো, বাঁচাও।" চিৎকারটা বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ি থেকে আসেনি, এসেছে তার পাশের বাড়ি থেকে — বিধবা সখিনা খালার বাড়ি থেকে।
আমরা সবাই দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি সখিনা খালার বারান্দায় একটা কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া, আর তার মাঝখানে সখিনা খালার বারো বছরের ছেলেটা পাগলের মতো হাত-পা ছুড়ছে। তার চোখ উল্টে সাদা হয়ে গেছে। আর তার গলার কাছে সেই কালো দাগটা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে, যেন অদৃশ্য কোনো হাত তাকে টিপে ধরেছে।
আমরা থমকে গেলাম। হঠাৎ ছেলেটার মুখ দিয়ে একটা যান্ত্রিক গলার আওয়াজ বের হলো, "কাছে আসবি না, কাছে এলেই শেষ। আমার বলি চাই, নরবলি চাই আমার।" ভয়ে আমাদের হাত থেকে লাঠি পড়ে যাওয়ার দশা। ইমাম সাহেব চিৎকার করে বললেন, "সবাই আজান দে, জোরে আজান দে।" আমরা অনেক মানুষ একসাথে চিৎকার করে আজান দেওয়া শুরু করলাম। সে আওয়াজে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠলো। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, আজানের শব্দ কানে যেতেই ছেলেটা নিস্তেজ হয়ে গেল। কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়াটা জানালার ফাঁক দিয়ে শিস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল।
আমরা যখন ছেলেটাকে ধরলাম, সে তখন কাঁদছে। তার গলায় তকতকে কালো দাগ। কিন্তু সে বেঁচে আছে। ধোঁয়াটা যেদিকে গেল, আমরা টর্চ মেরে দেখতে পেলাম, সেটা সোজা গিয়ে ঢুকলো আবার সেই বদরুদ্দিন স্যারের বাড়িতে। এবার আর গ্রামের মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা গেল না। সবাই মশাল আর লাঠি নিয়ে স্যারের বাড়ির গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আমিও ছিলাম সেই ভিড়ের মধ্যে। মনের মধ্যে একটা খচখচানি ছিল — সত্যিই কি বদরুদ্দিন স্যার এসব করছেন, নাকি অন্য কেউ তার বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে? কিন্তু গণপিটুনির মেজাজ তখন তুঙ্গে, লজিক সেখানে কাজ করে না।
আমরা যখন স্যারের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলাম, তখন দেখি স্যার আর তার স্ত্রী জায়নামাজে বসে কাঁপছেন। আর তাদের পাঁচটা বাচ্চা কোনায় চুপসে আছে। একজন স্যারকে গিয়ে লাথি মারলো। বদরুদ্দিন স্যার ছিটকে পড়লেন, "ভাই আপনারা ভুল করছেন, আমি কিছু জানিনা, বিশ্বাস করেন।" শুরু হলো তল্লাশি — আলমারি, শোকেস, বিছানার নিচ, সব তছনছ করা হলো।
প্রথমে কিছুই পাওয়া গেল না। কিন্তু রান্নাঘরের পাশে একটা ছোট্ট স্টোররুম ছিল, সেটা সবসময় তালাবদ্ধ থাকতো। মাতব্বর সাহেবের হুংকার শোনা গেল, "এই ঘরের চাবি দে।" বদরুদ্দিন স্যার আমতা আমতা করে বললেন, "ওটাতে তো পুরনো আসবাবপত্র।" তিনি চাবি না দেওয়ায় কয়েকজন মিলে কুড়াল দিয়ে কোপ দিয়ে তালা ভাঙলো।
দরজা খোলার পর ভক করে একটা পচা গন্ধ বের হলো — ইঁদুর মরা বা পচা মাংসের গন্ধ। আমরা নাকে রুমাল দিয়ে ভেতরে উঁকি দিলাম। আর যা দেখতে পেলাম, তাতে বদরুদ্দিন স্যারের উপর আমাদের যেটুকু করুণা ছিল সব উড়ে গেল। ঘরটা আসবাবপত্রের জন্য না। ঘরটা সাজানো হয়েছে একটা পূজার বেদির মতো। মেঝেতে লাল শালু কাপড় বিছানো, তার উপর রাখা একটা মানুষের মাথার খুলি, কিছু হাড়কড় আর অনেকগুলো ছোট ছোট মাটির পুতুল — পুতুলগুলোর গায়ে পিন ফোটানো।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিসটা ছিল একটা লাল মলাটের খাতা। ইমাম সাহেব খাতাটা তুলে নিলেন, তার হাত কাঁপছিল। তিনি খাতাটা খুলে প্রথম পাতায় চোখ বোলালেন, তারপর তার মুখটা ছাইবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "ইয়া মাবুদ, এতো শয়তানের লিস্ট।" খাতাটাতে নাম লেখা — এক নম্বর তোফাজ্জল হোসেন, মৃত। দুই নম্বর গোলাম মাওলা, মৃত। তিন নম্বর আলিমউদ্দিন, মৃত। চার নম্বর আমার ফুপা, মৃত। এভাবে সাতজনের নাম, এবং সবার নামের পাশে লাল কালি দিয়ে ক্রস চিহ্ন দেওয়া।
আর তার নিচেই লেখা আট নম্বরে সখিনা বিবির ছেলের নাম। নামের পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন, কারণ সে আজ বেঁচে গেছে। এবং তারপর নয় নম্বরে লেখা আমার নাম — মিন্টু। আমার নিজের নাম দেখে আমার মাথা ঘুরে গেল। আমি দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। তার মানে পরের টার্গেট আমি।
বদরুদ্দিন স্যার তখন চিৎকার করে বলছেন, "আমি জানিনা, এগুলো আমার না, কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য এগুলো করে রেখেছে, আমি কসম করে বলছি।" কিন্তু কে শোনে কার কথা। খাতাটা দেখার পর গ্রামের মানুষ তখন হিংস্র পশু হয়ে গেছে। বদরুদ্দিন স্যার আর তার স্ত্রীকে উঠোনে টেনে বের করা হলো। তার বাচ্চারা বাবার পায়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, "বাবাকে মেরো না।" কিন্তু উত্তেজিত জনতা বাচ্চাদের ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে ঢেলে দিল।
আমার চোখের সামনে বদরুদ্দিন স্যারকে পেটাতে পেটাতে আধমরা করে ফেলল। রক্তে তার সাদা পাঞ্জাবি লাল হয়ে গেছে। তিনি শুধু ফিসফিস করে বলছেন, "আল্লাহ, তুমি বিচার করো। আমি নির্দোষ।" কিন্তু মানুষের আক্রোশ তখন অন্ধ। কেউ একজন বলল, "এই শয়তানদের পুলিশে দিলে ঝাড়া পেয়ে যাবে, তার চেয়ে আজকেই এর শেষ দিকে ছাড়বো না।"
তখনই ঘটলো আসল ঘটনা। সেটা আমাদের সব ধারণা পাল্টে দিল এবং প্রমাণ করে দিল যে আমরা কত বড় ভুল করতে যাচ্ছিলাম। তখন রাত বোধহয় সাড়ে তিনটা বা পৌনে চারটা। বদরুদ্দিন স্যারের বাড়ির উঠোনে তখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। মশাল জ্বলছে, মানুষের চিৎকারে কান বাঁধায়। বদরুদ্দিন স্যার আর তার স্ত্রী তখন মাটিতে পড়ে আছেন, আধমরার অবস্থা।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন গ্রামের এক উগ্র যুবক সাদেক হাতে একটা বড় বাঁশ নিয়ে বদরুদ্দিন স্যারের মাথায় শেষ বাড়িটা মারতে উদ্যত হলো, তখনই ঘটনাটা ঘটল। সাদেক লাঠিটা উপরে তুলল ঠিকই, কিন্তু আর নামাতে পারলো না। হঠাৎ করে সাদেকের পুরো শরীরটা পেছনের দিকে ভেঙে গেল — মানুষের শরীর যে পেছনের দিকে এতখানি বাঁকতে পারে তা আমাদের জানা ছিল না। মটমট করে ভাঙার শব্দ হলো। সাদেক হাত থেকে লাঠিটা ফেলে দিল, আর নিজের দুই হাত দিয়ে নিজের গলায় চেপে ধরলো। তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক গোঙানি বের হলো। চোখ দুটো কোটর থেকে যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সবাই থমকে গেল। যে যেখানে ছিল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল। বদরুদ্দিন স্যার তো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন, তিনি নড়ছেন না। তাহলে সাদেককে কে মারছে? ইমাম সাহেব চিৎকার করে বললেন, "সাদেক, কী হলো তোর? কেউ ধরেছে?" কয়েকজন সাহসী যুবক এগিয়ে সাদেকের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তাদের শক্তি সাদেকের অতিপ্রাকৃত শক্তির কাছে কিছুই না। সাদেক এক ঝটকায় তিনজন জোয়ান ছেলেকে ছিটকে ফেলে দিল, যেন তারা তুলার পুতুল।
তারপর সাদেক সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার ঘাড়টা অদ্ভুতভাবে একপাশে কাত হয়ে আছে, যেন ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে। সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। সেই চোখের দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলবো না। সে ইমাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে হাসলো। কিন্তু সেই হাসি সাদেকের না। সেই হাসিটা ছিল হাড়হিম করা, যেন গলার ভেতর থেকে কেউ পাথর খসিয়ে শব্দ করছে। সে কথা বলল, কিন্তু সেটা সাদেকের গলা না — একটা ভারী, কর্কশ এবং একই সাথে মিহি কণ্ঠস্বর, "মজা পেলি তোরা, খুব মজা পেলি তাই না?"
ইমাম সাহেব কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "কে তুই? কী চাস?" সাদেকের শরীর থরথর করে কাঁপছে, সে নিজের বুকের জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। আমরা দেখতে পেলাম তার বুকের উপর নখ দিয়ে খামচানোর দাগ। সে বলল, "তোরা যাকে মারলি সে তো আমার গোলাম না, সে তো তোদের মতোই ভীতু। কিন্তু তোরা আমার কাজ সহজ করে দিলি।" হাসির শব্দটা বাতাসের সাথে মিশে এক ভুতুরে প্রতিধ্বনি তৈরি করল।
"তোরা আমার লিস্ট দেখেছিস? দেখেছিস তো? নয় নম্বর কে? বল — নয় নম্বর কে?" আমার বুকের ভেতর তখন ধক করে উঠলো। নয় নম্বর তো আমি, মিন্টু। সাদেক আমার দিকে আঙুল তুলল। আমি ভিড়ের মধ্যে সবার পেছনে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিলাম, ও আমাকে দেখার কথা না। কিন্তু ও সোজা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "মিন্টু, প্রস্তুত হ। তোর সময় ঘনিয়ে আসছে।" এটুকু বলেই সাদেক ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল। মুখ দিয়ে ফেনার মতো ক্যাচলা বের হতে লাগল।
আর সাথে সাথে বদরুদ্দিন স্যারের ঘরের চালের উপর একটা বিরাট শব্দ হলো — ধুপধাপ ধুপধাপ, যেন বিশাল ভারী কিছু একটা লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। সবাই উপরের দিকে টর্চ মারলো। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। শুধু বাতাসের শস শব্দ আর দূরে বাঁশের ভেতর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের কান্না।
মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে গেল। যে জনতা একটু আগে বদরুদ্দিন স্যারকে মারার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল, তারা এখন ভয়ে দিকবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে পালাতে শুরু করল। আমি পালাতে পারলাম না। আমার পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে, আমার শরীর অবশ হয়ে আসছে। মনে হলো কেউ একজন অদৃশ্য বরফের হাত দিয়ে আমার কলারটা ছুঁয়ে আছে।
ইমাম সাহেব আর মাতব্বর কাকা আমাকে টেনে ধরলেন, "মিন্টু, এখানে থাকা যাবে না।" আমরা কোনোমতে ধরাধরি করে সাদেককে আর বদরুদ্দিন স্যারকে কাঁধে তুলে নিলাম। স্যারের অবস্থা খুব খারাপ, পালস পাওয়া যাচ্ছে না বললেই চলে। আর সাদেক অজ্ঞান, কিন্তু তার শরীর আগুনের মতো গরম। আমরা তাদের নিয়ে সোজা ছুটলাম গ্রামের একমাত্র হাতুড়ে ডাক্তার মজিদ চাচার ডিসপেন্সারিতে।
মজিদ চাচা তখন গভীর ঘুমে। আমাদের ডাকাডাকিতে তিনি থরফর করে উঠলেন। মজিদ চাচা বদরুদ্দিন স্যারের পালস চেক করলেন, চোখ উলটে দেখলেন, তারপর গম্ভীর মুখে বললেন, "অবস্থা তো ভালো না। প্রচুর ব্লিডিং হয়েছে, আর হার্টবিট খুব স্লো। আমার এখানে হবে না, সদর হাসপাতালে নিতে হবে। তবে আপাতত আমি একটা ইনজেকশন আর স্যালাইন দিয়ে দিচ্ছি।" আর সাদেকের দিকে তাকিয়ে তিনি অবাক হলেন, "এরে কি চিনে ধরছে? শরীর তো পুরাই আগুনের গোলা।" থার্মোমিটার লাগানোর পর মজিদ চাচার চোখ কপালে উঠলো — একশো ছয় ডিগ্রি।
"মানুষের শরীরে এত তাপমাত্রা থাকলে তো ব্রেন ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সাদেক দিব্যি শ্বাস নিচ্ছে।" মজিদ চাচা বললেন, "ভাই, এসব আমার বিদ্যাবুদ্ধির বাইরে। আমি ওষুধ দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনে হয় না এতে কাজ হবে। আপনারা বরং ভোর হলে কোনো বড় হুজুর বা কবিরাজ আনেন।" আমরা মজিদ চাচার ডিসপেন্সারিতে বাকি রাতটা কাটালাম। বদরুদ্দিন স্যারের জ্ঞান ফিরলো না। আর সাদেকের মাঝে মাঝে জ্ঞান ফিরছে, আবার অজ্ঞান হচ্ছে। জ্ঞান ফিরলে সে অদ্ভুত সব কথা বলছে, "ও আসছে, আমাকে নিতে আসছে, তোরা কেউ বাঁচবি না।"
ভোর হওয়ার সাথে সাথে আমরা একটা ভ্যান ভাড়া করে বদরুদ্দিন স্যারকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। সাথে তার স্ত্রী আর দুই ভাই গেলেন। আমরা কয়েকজন গ্রামে থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রয়ে গেলাম। সকাল দশটার দিকে খবর এলো, বদরুদ্দিন স্যার আইসিইউতে আছেন। ডাক্তাররা বলেছেন তার মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে, ইন্টারনাল হেমোরেজ হয়েছে, বাঁচার চান্স কম।
কিন্তু আসল আতঙ্কের শুরু হলো আমার নিজের শরীর নিয়ে। দুপুর গড়াতে আমি খেয়াল করলাম আমার ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। প্রথমে ভাবলাম হয়তো ভয়ে গলা শুকিয়ে গেছে। কিন্তু পানি খাওয়ার পরও সেই অস্বস্তি আর গেল না। মনে হলো গলার ভেতরে, ঠিক শ্বাসনালির কাছে, একটা দলা পাকিয়ে আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি হা করে গলা দেখার চেষ্টা করলাম — টনসিল বাড়েনি, কোনো লালচে ভাবও নেই। কিন্তু ব্যথাটা এমন যেন কেউ ভেতর থেকে আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে রেখেছে। আমি মাকে কিছু বললাম না, মা এমনিতেই আতঙ্কে আছেন।
বিকেলের দিকে আমার বন্ধু রফিক এল, খুব উত্তেজিত। "মিন্টু, শুনেছিস? সাদেকের অবস্থা নাকি আরো খারাপ হইছে। ওরে নাকি খাটের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে, ও নাকি নিজের জিব কামড়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতেছে।" রফিক আরো বলল, "আর বদরুদ্দিন স্যারের ঘর থেকে যে খাতাটা পাওয়া গেছে সেটা নিয়ে ইমাম সাহেব আর পুলিশ নাকি কথা বলতেছে। পুলিশ বলছে এটা কোনো সাইকোপ্যাথের কাজ। কিন্তু ইমাম সাহেব বলতেছেন এই খাতাটা বদরুদ্দিন স্যারের হাতের লেখা না। হাতের লেখাটা নাকি খুব প্রাচীন ধাঁচের, আর কালির বদলে ওইটা নাকি প্রাণীর রক্ত দিয়ে লেখা।" আমার শরীর গুলিয়ে উঠল।
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। মনে হলো বাতাসের অভাব হচ্ছে। আমি জানালা খুলে দিলাম। বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি বইছে, কারেন্ট নেই, হ্যারিকেনের আলোয় ঘরটা কেমন যেন ভৌতিক লাগছে।
হঠাৎ আমার নাকের কাছে একটা উৎকট গন্ধ এল — বোটকা গন্ধ, অনেকটা ছাগলের গায়ের গন্ধের মতো। আমি এদিক-ওদিক তাকালাম, ঘরে আমি একা, মা রান্নাঘরে। আমার খাটের নিচ থেকে একটা শব্দ হলো, যেন কেউ নখ দিয়ে ফ্লোর আঁচড়াচ্ছে। আমি টর্চটা হাতে নিলাম, কিন্তু খাট থেকে নামার সাহস পেলাম না। মাকে ডাকলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না — আমার গলায় সেই দলাটা যেন আরো বড় হয়ে গেছে, শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে আসছে।
হঠাৎ আমার ঘরের দরজাটা ক্যাচ ক্যাচ করে খুলে গেল — অথচ আমি ছিটকিনি লাগিয়ে রেখেছিলাম। বাতাসের ঝাপটায় দরজাটা দুলতে লাগল। আর সেই খোলা দরজার ওপাশে বারান্দার অন্ধকারে আমি দুটো চকচকে চোখ দেখতে পেলাম। উচ্চতাটা মানুষের সমান নয়, অনেক উঁচুতে, প্রায় দরজার ফ্রেমের উপরের দিকে। তার মানে কি? ওটা শূন্যে ভেসে আছে, নাকি ওটার উচ্চতা সাত-আট ফুট? চোখ দুটো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, পলক পড়ছে না।
আমি ইউনুস পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু জিহ্বাটা ভারী হয়ে গেছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ছায়াটা ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে ঢুকল। আবছা আলোয় আমি দেখতে পেলাম — এটা সেই মহিলা না, এটা অন্য কিছু। এটার শরীরটা কালো আলখেল্লায় ঢাকা, মুখটা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু হাতগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, আঙুলগুলো লিকলিকে, আর নখগুলো পাখির মতো বাঁকানো। সে আমার খাটের দিকে এগিয়ে এল, কোনো শব্দ হলো না হাঁটার।
আমার মনে হলো আমি অজ্ঞান হয়ে যাবো। কিন্তু সেন্স হারানোর আগে আমি স্পষ্ট শুনলাম, সে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "নয় নম্বর, তোর পালা। কিন্তু এখনই না। তোকে আমি তিলে তিলে মারবো। তোর রক্ত আমার চাই। কিন্তু তার আগে তোকে একটা কাজ করতে হবে।" আমি কোনোমতে বললাম, "কী কাজ?" সে বলল, "বদরুদ্দিনকে বাঁচাতে চাস, নাকি নিজে বাঁচাতে চাস? পছন্দ তোর। যদি নিজেকে বাঁচাতে চাস, তবে বদরুদ্দিনের ছোট মেয়েটাকে আমার কাছে নিয়ে আয়, আজ রাত বারোটার মধ্যে শ্মশানঘাটে।" এই বলে সে হাওয়া হয়ে গেল।
শুধু ঘরের বাতাসে পচা গন্ধটা ফুরফুর করছে। এটা কি আসলে সত্যি নাকি আমার মনের ভুল? আমি জানিনা। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা — আমি কী করবো? নিজের জান বাঁচাবো, নাকি ওই মাসুম বাচ্চাটাকে বাঁচাবো? মা এসে দেখলেন আমি কাঁদছি, কপালে হাত দিয়ে বুঝলেন আমার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি একা পারবো না, আমাকে ইমাম সাহেবের কাছে যেতেই হবে। মাকে বললাম একটু ইমাম সাহেবের কাছে যাচ্ছি। মা প্রথমে যেতে দিতে চাইলেন না, কিন্তু আমার জেদের কাছে হার মানলেন। রেনকোট গায়ে দিয়ে টর্চ হাতে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাঘাট পুরো জনমানবহীন। বৃষ্টির কারণে সব ঝাপসা। কাদা মারিয়ে আমি মসজিদের হুজুরখানায় গিয়ে পৌঁছলাম।
ইমাম সাহেব জায়নামাজে বসে তসবি টিপছেন। আমাকে দেখে চিন্তিত মুখে বললেন, "কিরে, তোর মুখে এমন ফ্যাকাসে কেন? বস সেখানে।" আমি হুজুরের পায়ের কাছে বসে পড়লাম, তারপর একদমে সব খুলে বললাম — ওই ছায়ামূর্তি, তার হুমকি, আর সেই জঘন্য শর্ত। সব শুনে ইমাম সাহেব দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তিনি বললেন, "পিন্টু, তুই খুব বড় পরীক্ষার সামনে। এই শয়তান তোকে ধোঁকা দিচ্ছে। তুই যদি বাচ্চাটাকে নিয়ে যাস, তবুও সে তোকে ছাড়বে না — শয়তানের ওয়াদার কোনো দাম নেই। ও তোকে দিয়ে একটা নিষ্পাপ প্রাণ হত্যা করাবে, তারপর তোকেও মারবে। ও চায় তুই ঈমানহারা হও।" আমি কেঁদে ফেললাম, "আমি তাহলে কী করবো হুজুর? আমার তো দম বন্ধ হয়ে আসছে।"
ইমাম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। একটা আলমারি থেকে পুরনো একটা কিতাব আর একটা ছোট শিশি বের করলেন, শিশিতে কালো চিড়া তেলের মতো কিছু একটা। বললেন, "শোন, এটা সাধারণ কোনো জিনভূত না। এটা ইফরিত বা ওই গোত্রীয় কোনো শক্তিশালী শয়তান। একে তাড়াতে হলে আমাদের শেকড় খুঁজে বের করতে হবে। বদরুদ্দিন মাস্টারের বাড়ি থেকে যে খাতাটা পাওয়া গেছে, ওটাতে একটা নির্দিষ্ট জায়গার কথা বলা আছে — গ্রামের শেষ মাথায় ওই যে শ্মশানের পেছনের জঙ্গলটা। আমার ধারণা ওখানেই আসল আস্তানা। ওই শয়তান তোকে শ্মশানঘাটে যেতে বলেছে, কারণ ও ওখানেই থাকে। আমাদের আজ রাতেই ওখানে যেতে হবে — তবে একা না, আমি, তুই আর গ্রামের আরো কয়েকজন পরহেজগার মুরুব্বি।"
শুনেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। "হুজুর, ওখানে যাবো? আজ রাতে? বৃষ্টির মধ্যে?" তিনি বললেন, "হ্যাঁ, আজকেই। কারণ আজ অমাবস্যা। তান্ত্রিক বা শয়তানী শক্তির জোর আজ সবচেয়ে বেশি থাকে। আজ যদি আমরা ওটার শেকড় কাটতে না পারি, তবে কালকে সূর্য হয়তো তোর বাড়ির জন্য উঠবে না।"
ইমাম সাহেবের কথায় একটা জোর ছিল। আমি সাহস সঞ্চয় করলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা পাঁচজন মানুষ — ইমাম সাহেব, আমি, মুয়াজ্জিন চাচা আর গ্রামের দুজন সাহসী যুবক রফিক আর কামাল — একসাথে বের হলাম। সবার হাতে টর্চ, আর ইমাম সাহেবের হাতে সেই কিতাব আর একটা ভেতরে লেখা লাঠি।
আমরা শ্মশানের কাছাকাছি যখন পৌঁছলাম, তখন বৃষ্টি একটু কমেছে। কিন্তু বাতাস খুব জোরে বইছে। পাশের বাঁশগুলো ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে একে অপরের সাথে বাড়ি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন হাজার হাজার কঙ্কাল তাদের হাড়গোড় নাড়াচ্ছে। একটা বিশাল পুরনো বটগাছ। সেই গাছের নিচে একটা ভাঙা মঠের মতো স্ট্রাকচার আছে, অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত।
আমরা যখন ওই মঠের কাছাকাছি গেলাম, হঠাৎ ইমাম সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। আমরা সবাই স্থির হয়ে গেলাম। মঠের ভেতর থেকে একটা আবছা লাল আলো দেখা যাচ্ছে, আর তার সাথে ভেসে আসছে একটা অদ্ভুত মন্ত্র পড়ার শব্দ — মনে হচ্ছে কোনো মানুষ না, কোনো জন্তু মন্ত্র পড়ছে।
ইমাম সাহেব ফিসফিস করে বললেন, "বিসমিল্লাহ বলে সবাই আয়াতুল কুরসি পড়। কেউ ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন, আল্লাহর শক্তির উপর কোনো শক্তি নাই।" আমি ধীর পায়ে এগলাম। মঠের ভাঙা জানালা দিয়ে উঁকি দিতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে আমার রক্ত জমে গেল।
ভেতরে সেই মহিলা বসে আছে, তার সামনে একটা আগুনের কুণ্ড। আর আগুনের ওপাশে বসে আছেন আমাদেরই গ্রামের একজন মানুষ — যাকে আমরা সবাই চিনি, যাকে আমরা সবাই সম্মান করি — তিনি আর কেউ নন, আমাদের গ্রামের পোস্টমাস্টার আজমল কাকা। আজমল কাকার চোখ বন্ধ, তার সামনে বদরুদ্দিন স্যারের ছোট মেয়েটার একটা ছবি। আর ওই মহিলাটি আজমল কাকার চারপাশ দিয়ে ঘুরছে, নিজের গা থেকে চামড়া তুলে আগুনের মধ্যে ফেলছে। আগুনটা দপদপ করে জ্বলছে নীল রঙের শিখা নিয়ে।
রফিক আমার কানে ফিসফিস করে বলল, "পিন্টু, আজমল কাকা — উনি তো খুব ভালো মানুষ। উনি কেন এসব করবেন?" ইমাম সাহেব ইশারা করলেন চুপ থাকতে। তিনি আমাদের নিয়ে দরজার দিকে এগলেন।
দরজার সামনে যেতেই হঠাৎ ওই মহিলাটি ঘুরে তাকালো। এবার আমরা তার মুখ স্পষ্ট দেখলাম। তার মুখটা কোনো মানুষের মুখ না — নাক নেই, শুধু দুটো গর্ত, ঠোঁটগুলো কাটা, দাঁতগুলো হাঙরের মতো ধারালো। সে আমাদের দেখে চিৎকার করে উঠল, "এসেছিস তোরাও? আজ সবার ভোজ হবে। আজমল, উঠ, মেহমান এসেছে।"
আজমল কাকা চোখ খুললেন, "স্বাগতম ইমাম সাহেব। আমি জানতাম আপনি আসবেন। তাই তো আজ আপনার জন্য আয়োজন রেখেছি।" ইমাম সাহেব হুংকার দিলেন, "আজমল, তুই মানুষ হয়ে শয়তানের গোলামি করিস। আল্লাহকে ভয় কর।" আজমল কাকা হেসে উঠলেন, "আমার একমাত্র ছেলেটা ক্যান্সারে ধুকে ধুকে মরল, তখন কেউ বাঁচাতে আসেনি। কিন্তু ইফরিত আমাকে কথা দিয়েছে — ও আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে, বিনিময়ে ও শুধু কিছু প্রাণ চায়।"
ইমাম সাহেব বললেন, "তোর ছেলে মরে গেছে, আজমল। মৃত মানুষ ফিরে আসে না। তুই ধোঁকার মধ্যে আছিস।" আজমল কাকা চিৎকার করে উঠলেন। তার গলার আওয়াজ পাল্টে গেল। সাথে সাথে ওই পিশাচিনীটি আমাদের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল — তার গতি ছিল বিদ্যুতের মতো। মুয়াজ্জিন চাচা সামনে ছিলেন, কিছু বোঝার আগে মহিলাটি তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। তার নখ দিয়ে মুয়াজ্জিন চাচার বুকে আঁচড় কাটল, রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হলো।
ইমাম সাহেব তার হাতের ভেতের লাঠিটা দিয়ে মহিলাটিকে বাড়ি মারলেন। লাঠিটা লাগার সাথে সাথে মহিলাটি ছিটকে দূরে গিয়ে পড়ল, যেন আগুনের ঝাঁকা খেয়েছে। তার শরীর থেকে ধোঁয়া বের হতে লাগলো। এদিকে আজমল কাকাও বসে নেই। তিনি আগুনের কুণ্ড থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠ তুলে নিলেন — অদ্ভুত ব্যাপার, তার হাত পুড়লো না। তিনি সেই জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
আমরা সবাই তখন যে যার জান বাঁচাতে ব্যস্ত। মুয়াজ্জিন চাচা মাটিতে কাতরাচ্ছেন, রফিক আর কামাল তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। আর আমি তখন দেয়ালের কোনায় আটকে গেছি। আজমল কাকা আমার দিকে এগিয়ে আসছেন, "নয় নম্বর, তুই তো আমার লিস্টে আছিস। আজ তোর পালা।" তিনি জ্বলন্ত কাঠটা আমার মুখের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমি তাপ অনুভব করলাম, আমার চোখের পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে মঠের বাইরে থেকে একটা বিকট শব্দ হলো — আকাশ চিড়ে বজ্রপাত। আর সেই শব্দের সাথে সাথে পুরো মঠটা কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ইটের টুকরো খসে পড়তে লাগলো। আমরা সবাই টাল সামলাতে পারলাম না। আজমল কাকাও মোচড় খেয়ে পড়ে গেলেন। তার হাতের জ্বলন্ত কাঠটা ছিটকে গিয়ে পড়লো লাল কাপড়ের উপর রাখা মাটির পুতুলগুলোর উপর।
আর সাথে সাথে ঘর ভর্তি একটা হাহাকার ধ্বনি উঠলো। মনে হলো হাজার হাজার মানুষ একসাথে যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। আগুন ধরে গেল লাল কাপড়ে। আজমল কাকা মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগলেন, "না না, আমার সাধনা, আমার ছেলে।" তিনি সেই পুতুলগুলো বাঁচানোর জন্য আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। "আজমল কাকা, কী করেন কী?" — আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম। কিন্তু ইমাম সাহেব আমাকে খপ করে ধরে ফেললেন, "যাস না মিন্টু, ওটা এখন আর আজমল না, ওটা এখন শয়তানের পুতুল।"
আগুন মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ওই মহিলাটি আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে, তার শরীরে আগুন লেগেছে কিন্তু সে পড়ছে না, সে খিলখিল করে হাসছে, "মুক্তি, মুক্তি, অবশেষে মুক্তি।"
আমরা মুয়াজ্জিন চাচাকে নিয়ে কোনোমতে মঠ থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখন ঝড় শুরু হয়েছে, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গায়ের চামড়া ফুটো করে দিচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি সেই পুরনো মঠের ভেতর থেকে আগুনের লেলিহান শিখা বের হচ্ছে। আর তার ভেতর থেকে ভেসে আসছে আজমল কাকার অমানবিক চিৎকার, "বাঁচাও, ইফরিত, আমাকে বাঁচাও, তুমি কথা দিয়েছিলে।"
আমরা দৌড়াতে লাগলাম গ্রামের দিকে। কাদায় আছড়ে পড়লাম, হাত-পা কেটে গেল, কিন্তু থামা যাবে না। গ্রামে ঢুকে দেখলাম অবস্থা আরো খারাপ। প্রতিটা বাড়ির সামনে একটা করে মরা কাক পড়ে আছে, কাকগুলোর পেট চেরা। আর মসজিদের মাইকটা আবার বেজে উঠলো — এই মাঝরাতে ঝড়ের মধ্যে, যেখানে কারেন্ট নেই। কোথা থেকে যেন একটা আওয়াজ বারবার ভেসে এলো, "পালাবি কোথায়? খেলা তো মাত্র শুরু হলো।"
বৃষ্টির তোড়, মেঘের গর্জন আর সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বর — সব মিলিয়ে এক নারকীয় পরিবেশ। আমরা দৌড়ে মসজিদের দিকে এগলাম। মসজিদের গেটের কাছে আসতে একটা বিকট গন্ধ নাকে ধাক্কা খেল — সেই বোটকা গন্ধ, কিন্তু এবার তার সাথে মেশানো পোড়া মাংসের গন্ধ।
ইমাম সাহেব সবার আগে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। আমরাও তার পেছনে। মসজিদের বারান্দার গ্রিল বেয়ে একটা মানুষের শরীর ঝুলে আছে, অনেকটা মাকড়সার মতো — হাত-পাগুলো গ্রিলের ফাঁক দিয়ে অদ্ভুতভাবে ঢুকিয়ে শরীরটাকে ঝুলিয়ে রেখেছে, মাথাটা নিচের দিকে, পাগুলো উপরের দিকে। সেটা আর কেউ নয় — সাদেক। যাকে আমরা মজিদ চাচার ডিসপেন্সারিতে রেখে এসেছিলাম, যে নাকি সেখানে বেহুশ ছিল, সে এখানে এলো কীভাবে?
"এসেছিস? তোরা কি ভেবেছিলি আজমলকে মেরে ফেললেই সব শেষ? আমি তো আছি। আমি তোদের রক্তে আছি।" ইমাম সাহেব চিৎকার করে উঠলেন, "নেমে আয় সাদেক, এসব করিস না, নেমে আয়।" সাদেক হেসে উঠলো। তার শরীরটা গ্রিল থেকে খসে পড়ল — সাধারণ মানুষ হলে হাত-পা ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। কিন্তু সাদেক মাটিতে পড়েই চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
তার মেরুদণ্ড বাঁকানো, ঘাড়টা এমনভাবে ঘোরানো যে মুখটা আমাদের দিকে কিন্তু শরীরটা উল্টো দিকে। তার চোখ দুটো রক্ত জমে লাল হয়ে আছে, মুখ দিয়ে ফেনার মতো সাদা আর হলুদ রঙের লালা পড়ছে। সে আমাদের দিকে এক পায়ে এগোল, "ইমাম, তুই আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলি?"
ইমাম সাহেব আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ভয় পাবি না, কেউ নড়বি না। সবাই আয়াতুল কুরসি জোরে পড়। কামাল, রফিক, মিন্টু — তোরা প্রস্তুত থাক, ওকে ধরতে হবে। ও এখন মানুষ না, ওর গায়ে এখন শয়তানি শক্তি। কিন্তু আমাদের ওকে কাবু করতেই হবে।" আমরা তিনজন ভয়ে কাঁপছিলাম, কিন্তু ইমাম সাহেবের ধমকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আমরা তিনজন সাদেকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
একটা শুকনো পাতলা মানুষের গায়ে যে এত শক্তি থাকতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আমরা তিনজন জোয়ান ছেলে, গ্রামে হালচাষ করি, গায়েও শক্তি আছে। কিন্তু সাদেক আমাদের যেন খরকুটোর মতো উড়িয়ে দিল। আমি ওর ডান হাতটা চেপে ধরলাম, মনে হলো কোনো জ্যান্ত ইলেকট্রিক তার ধরে আছি। শক খাওয়ার মতো আমার শরীরটা ঝনঝন করে উঠলো। ওর গায়ের তাপমাত্রা এত বেশি যে আমার হাতের তালু পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
সাদেক একটা হুংকার দিল — মানুষের কণ্ঠের আওয়াজ নয় সেটা, মনে হলো কোনো বুনো জানোয়ার বা সিংহ গর্জন করছে। সে এক ঝটকায় কামালকে লাথি মেরে ফেলে দিল, কামালের ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হলো। "ছাড় আমাকে, ছাড়, নইলে সবাইকে চিবিয়ে খাবো।" সে আমার দিকে মুখ টানলো। তার নিঃশ্বাসে সেই পচা গন্ধ। সে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "তেরো বছর আগে তোর ভাই মারা গেছে, ওকে আমরাই মেরেছি। এবার তোর পালা, মিন্টু, তোর কলিজাটা আমি কাঁচা খাবো।"
আমার ভাই? আমার তো কোনো ভাই নেই, আমি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ও কি ভুল বলছে, নাকি আমাকে কনফিউজ করার চেষ্টা করছে? ততক্ষণে ইমাম সাহেব এগিয়ে এসেছেন। তিনি সাদেকের কপালে হাত রাখলেন। সাদেক ছিটকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল, যেন আগুন লেগেছে, "না না, হাত সরাও, সরাও বলছি।" ইমাম সাহেব সাদেকের কপালে হাত চেপে উচ্চস্বরে রুকিয়া তেলাওয়াত শুরু করলেন।
সাদেকের চিৎকার আরো বেড়ে গেল। সে এবার নিজের মাথাটা মেঝের টাইলসের উপর ঠোকাতে শুরু করল, রক্তে মেঝে ভেসে যাচ্ছে। সে নিজেকে শেষ করে দিতে চাইছে। আমি আর রফিক মিলে সাদেকের মাথাটা চেপে ধরলাম। ও আমাদের হাতে কামড় বসিয়ে দিল, রফিকের হাত থেকে রক্ত ঝরছে, কিন্তু ও ছাড়লো না।
হঠাৎ সাদেক শান্ত হয়ে গেল। খুব করুণ গলায় বলল, "হুজুর, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি চলে যাবো, খুব ব্যথা করছে, দয়া করুন।" ইমাম সাহেব থামলেন না। তিনি বললেন, "ধোঁকা দিচ্ছিস, আমি তোকে চিনি। তুই মিথ্যাবাদী। তুই ইফরিত, বের হ।" সাদেক আবার হেসে উঠলো, সেই শয়তানি হাসি। "চিনে ফেলেছিস, চালাক। কিন্তু তোর ছেলেকে বাঁচাতে পারবি? সে এখন কোথায়, জানিস? ও আসছে — আমার সাঙ্গপাঙ্গরা ওকে দেখছে।"
ইমাম সাহেবের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল — তার ছোট ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, হোস্টেলে থাকে। মুয়াজ্জিন চাচা পেছন থেকে বললেন, "হুজুর, ও আপনার মন দুর্বল করতে চাইছে, বিশ্বাস করবেন না। আল্লাহ আপনার ছেলের সহায় আছেন, আপনি কাজ করুন।" ইমাম সাহেব আবার তেলাওয়াত শুরু করলেন।
এবার তিনি পানি পড়া ছিটিয়ে দিলেন সাদেকের মুখে। পবিত্র পানি সাদেকের গায়ে লাগতেই সে ফুটন্ত তেলে পড়ার মতো ছটফট করতে লাগল। তার শরীর থেকে ধোঁয়া বের হতে লাগলো, চামড়াগুলো কুঁকড়ে কালো হয়ে যাচ্ছে। "আমি যাবো না, এ শরীর আমার। আমি আজমলকে কথা দিয়েছি, ওর বংশ আমি শেষ করবো।" ধস্তাধস্তি চলল প্রায় ঘণ্টাখানেক। আমরা সবাই ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। আমার শার্ট ছিঁড়ে গেছে, হাতে কামড়ের দাগ। কামালের নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। রফিক ফ্লোরে বসে হাঁপাচ্ছে।
শেষমেষ ফজরের আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে সাদেক একটা লম্বা শ্বাস নিল। তার মুখটা হাঁ হয়ে গেল, চোয়াল প্রায় বুকের কাছে চলে এল। সে বমি করল — সাধারণ বমি না, কুচকুচে কালো রঙের আলকাতরার মতো ঘন তরল, আর তার সাথে বের হলো কিছু চুল, কয়েকটা মরা মাছি। বমির সাথে সাথে ঘর ভর্তি সেই উৎকট গন্ধটা ছড়িয়ে পড়ল। আমরা নাকে কাপড় দিলাম। সাদেক থপাস করে ফ্লোরে পড়ে গেল। তার চোখ বন্ধ, শ্বাস পড়ছে খুব ধীরে।
আমরা কেউ কথা বলতে পারছিলাম না, সবাই ফ্লোরে বসে পড়লাম। ইমাম সাহেব সাদেকের পাশে বসে তার পালস চেক করলেন, "বেঁচে আছে।" ফজরের আজান দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। মুয়াজ্জিন চাচা কাঁপতে কাঁপতে খালি গলায় আজান দিলেন। সেই আজানের ধ্বনি শুনে মনে হলো গ্রামের উপর থেকে যেন একটা ভারী পাথর নেমে গেল।
ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামের মানুষ মসজিদে আসতে শুরু করল। তারা সাদেকের অবস্থা আর মেঝের কালো বমি দেখে শিউরে উঠলো। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে একটা পোড়া লাশ উদ্ধার করা হলো। লাশটা এতটাই পুড়ে গেছে যে চেনার উপায় নেই, কিন্তু তার হাতের একটা আংটি দেখে আজমল কাকার স্ত্রী শনাক্ত করলেন যে এটা আজমল কাকার লাশ।
আজমল কাকার বাড়ি তল্লাশি করে আরো অনেক অদ্ভুত জিনিস পাওয়া গেল — মানুষের হাড়, অদ্ভুত সব নকশা করা কাগজ আর প্রচুর বিদেশী মুদ্রা। জানা গেল, আজমল কাকা অনেক আগে থেকেই কালো জাদু চর্চা করতেন। তার ছেলে মারা যাওয়ার পর তিনি পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন, এবং বিশ্বাস করতেন যে বলিদানের মাধ্যমে ছেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আর সেই মহিলা — তাকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ বা গ্রামবাসী কেউ তাকে দেখতে পায়নি। হয়তো সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, অথবা সে ফিরে গেছে তার অন্ধকার জগতে। সে "মুক্তি মুক্তি" বলে হাসছিল — হয়তো তাকে কালো জাদুর মাধ্যমে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর ঘরে আগুন লাগায় সেই উপকরণ নষ্ট হওয়ায় সে মুক্তি পেয়েছে।
বদরুদ্দিন স্যার প্রায় এক মাস আইসিইউতে ছিলেন। তিনি বেঁচে ফিরেছেন, কিন্তু প্যারালাইজড হয়ে গেছেন। এখন তিনি আর কথা বলতে পারেন না, শুধু ফেলফেলে করে তাকিয়ে থাকেন। তার স্ত্রী আর বাচ্চারা এখন তার সেবা করে। গ্রামবাসী নিজেদের ভুলের জন্য লজ্জিত হয়ে তাদের পরিবারকে সাহায্য করে।
আর সাদেক বেঁচে আছে, কিন্তু সে আর আগের মতো নেই। সে এখন কারো সাথে কথা বলে না। সারাদিন ঘরের কোনায় বসে বিড়বিড় করে। মাঝে মাঝে সে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে আর কাঁদে। ডাক্তাররা বলেছেন তার মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে। তার চিকিৎসা চলছে, কিন্তু ডাক্তাররা খুব একটা আশাবাদী না।
